ভোটার অংশগ্রহণ বাড়াতে তরুণদের ওপর ভরসা, রাজনৈতিক আস্থা ও নিরাপত্তাই মূল নির্ধারক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে অন্তর্বর্তী সরকার। রাজনৈতিক আস্থা, নিরাপত্তা ও দলীয় অংশগ্রহণের প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষকদের মতামত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। একই দিনে হবে গণভোটও। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবর্তনের পর এই নির্বাচন ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল। ভোটের দিন সর্বোচ্চ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে জোর প্রচার চালাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। নির্বাচনকে গণমুখী ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে আগের ১২টি সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার বেশি ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করাই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ১২০ জন। এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুণ ভোটার প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা ভোটের হার বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালে, যেখানে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। গত ১২টি নির্বাচনের ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৮৭ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট পড়েছিল। অন্যদিকে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে সর্বনিম্ন ২৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়, যা দেশের নির্বাচন ইতিহাসে নজিরবিহীন। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থার ওপরই ভোটার উপস্থিতির হার নির্ভর করে—এই পরিসংখ্যান তারই প্রতিফলন।
এবারের নির্বাচন ঘিরে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ না থাকা ভোটার উপস্থিতিকে কতটা প্রভাবিত করবে। যদিও অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, তবুও অনেকের ধারণা, দলটির অনুপস্থিতিতে ভোটের হার কমে যেতে পারে। বিশেষ করে তাদের কট্টর সমর্থকদের একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। হামলা বা মামলার আশঙ্কাও অনেককে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।
তবে সব সমর্থকের মনোভাব এক নয় বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হলে অনেক ভোটারই কেন্দ্রে যেতে আগ্রহী হতে পারেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলটির সব ভোটার একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না। যারা কট্টর নন, তাদের একটি বড় অংশ বিকল্প প্রার্থী বা দলকে ভোট দিতে পারেন, বিশেষ করে যেসব এলাকায় নিরাপত্তার আশ্বাস মিলেছে। আবার কোথাও কোথাও দলবদলের ঘটনাও দেখা যাচ্ছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দলের ভোটব্যাংক সাধারণত কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে—এক অংশ ভোটদান থেকে বিরত থাকে, এক অংশ ব্যালট নষ্ট করতে পারে এবং অন্য অংশ পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকল্প প্রার্থীকে সমর্থন জানাতে পারে। গত দেড় দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সুবিধাবাদী ও ত্যাগী কর্মীদের পার্থক্যও স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে মত বিশ্লেষকদের। ফলে এবারের ভোটের হার ও আচরণ ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসা নিশ্চিত করাই এখন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের ভোটের হার শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য, গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা এবং সরকারের প্রতি জনআস্থার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠবে।
টাঙ্গাইলে জনসভা ঘিরে প্রস্তুতি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা ২১ বছর পর টাঙ্গাইল সফরে যাচ্ছেন। বিকেল ৪টায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের দরুন চরজানা বাইপাস এলাকায় আয়োজিত নির্বাচনি সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তার। জেলায় এটিই তার প্রথম বড় রাজনৈতিক জনসভা।
জনসভাকে কেন্দ্র করে জেলা ও অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি দেখা গেছে। বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশের জেলা থেকে নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের আশা করা হচ্ছে। সমাবেশে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছাসেবক টিমও গঠন করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
দলীয় নেতারা বলছেন, এই জনসভা নির্বাচনি প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে। নির্বাচনি অঙ্গীকার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরার মাধ্যমে ভোটারদের আস্থা অর্জনই এই সফরের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তারা।
















