নির্বাচন আর মাত্র দুই সপ্তাহ দূরে। এই সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার একের পর এক দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চমূল্যের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা আগামী নির্বাচিত সরকারের হাত কার্যত বেঁধে দিচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও নীতিবিশেষজ্ঞরা।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনালের পণ্য পরিচালনা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি। এটি দেশের অন্যতম কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামো। এর আগে গত নভেম্বরে ডেনমার্কের একটি প্রতিষ্ঠানকে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ৩৩ বছরের ছাড়পত্র দেওয়া হয়। পাশাপাশি পাঙ্গাঁও নৌবন্দর পরিচালনার জন্য সুইজারল্যান্ডভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২২ বছরের চুক্তি চূড়ান্তের পথে।
পাঙ্গাঁও প্রকল্পে উন্মুক্ত দরপত্র থাকলেও লালদিয়া ও নিউ মুরিং টার্মিনাল সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র হয়নি। সরকারের মেয়াদ শেষের পথে এমন সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে। যে অন্তর্বর্তী সরকার একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের দায়িত্ব নিয়ে গঠিত হয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে এখন অভিযোগ উঠছে, তারা স্বচ্ছতা ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
বন্দর চুক্তির পাশাপাশি সরকার দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার জন্য ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া এবং ১১৮ জন জ্যেষ্ঠ আমলার পদোন্নতি। একই সঙ্গে একটি রাষ্ট্রনিযুক্ত কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে দুর্বল সরকারি অর্থব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
এই সব সিদ্ধান্তের আর্থিক ও রাজনৈতিক দায় আগামী সরকারকে বহন করতে হবে, যদিও এসব সিদ্ধান্তে তাদের কোনো ভূমিকা নেই।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে এই সিদ্ধান্তগুলোর সমালোচনা করে এক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বলেন, এটি কেবল অর্থনৈতিক বিচক্ষণতার অভাব নয়, বরং নীতিগতভাবে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। তাঁর মতে, একটি রূপান্তরকালীন সরকার শেষ মুহূর্তে দেশকে বহু বিলিয়ন টাকার দায়ে বেঁধে দিতে পারে না।
আরেকজন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ বলেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা এসব চুক্তিতে জনসমক্ষে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং পদ্ধতিগুলো আগের শাসনামলের চর্চার কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি বলেন, সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এসে সরকার নিজেই সেই সংস্কারের পথে হাঁটছে না, বরং এমন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখছে যা ভবিষ্যতে জনগণকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে ফেলতে পারে।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, সরকার ভেঙে যাওয়ার পর এই সিদ্ধান্তগুলোর দায়ভার কাকে দেওয়া হবে, যখন উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীরা আর জবাবদিহির আওতায় থাকবেন না।
প্রতিরক্ষা শিল্প অঞ্চল নিয়েও বিতর্ক
জাতীয় নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি সংবেদনশীল খাতে প্রবেশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে প্রায় ৮৫০ একর জমিতে একটি প্রতিরক্ষা শিল্প অঞ্চল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকার বলছে, এতে দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে এবং বৈশ্বিক বাজারে দেশের অবস্থান শক্ত হবে।
তবে সমালোচকদের মতে, নির্বাচনী বৈধতা ছাড়া এমন কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়াও সরকারের সামগ্রিক প্রবণতারই অংশ।
বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হলে বছরে অতিরিক্ত বিপুল ব্যয় চাপবে। দীর্ঘদিন বেতন সংশোধন না হওয়া ও মূল্যস্ফীতির প্রভাবের যুক্তি থাকলেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণ ও রাজস্ব ঘাটতির মধ্যে এটি একটি বড় আর্থিক ঝুঁকি।
বিমান কেনা ও কূটনীতি
সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় পোশাক রপ্তানিতে শুল্ক কমাতে সক্ষম হলেও এর বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থাকে বহু বিলিয়ন টাকার উড়োজাহাজ কেনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সিদ্ধান্তে বিকল্প নির্মাতার সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ হয়নি বলেও সমালোচনা রয়েছে।
এর পাশাপাশি নির্বাচনের ঠিক আগে বিমান সংস্থার পরিচালনা পর্ষদে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিদেশগামী কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা
সরকার নতুন করে শত শত জনশক্তি রপ্তানি সংস্থার লাইসেন্স দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে নজরদারি দুর্বল হবে এবং দুর্নীতি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ভাতা বাড়ানো ও সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে, যার বাস্তবায়ন করতে হবে পরবর্তী সরকারকে।
নির্বাচনের আগের ব্যয় বৃদ্ধি
সবশেষে, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি নির্বাচনের ঠিক আগে বিপুল অর্থের উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়ানো এবং মেয়াদ দীর্ঘ করার সিদ্ধান্তও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তগুলো স্বচ্ছতা ও অংশীজনদের আলোচনার অভাবে আগামী সরকারের জন্য একটি কঠিন মানদণ্ড তৈরি করছে। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি অনিচ্ছাকৃত, নাকি পরিকল্পিতভাবেই ভবিষ্যৎ সরকারকে চাপে ফেলার কৌশল।
















