অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরপর চারটি হাঙর আক্রমণের ঘটনা বিশেষজ্ঞদেরও বিস্মিত করেছে। সিডনির আশপাশের এলাকায় এত অল্প সময় ও এত কাছাকাছি দূরত্বে এমন ঘটনা আগে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। সাম্প্রতিক এই ঘটনার পর নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগে বহু সৈকত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং আবারও হাঙর নিধনের দাবি জোরালো হয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমস্যার মূল হাঙর নয়, বরং পরিবেশগত পরিস্থিতি ও মানুষের আচরণ।
১৮ জানুয়ারি সিডনি হারবারে সাঁতার কাটার সময় হাঙরের আক্রমণে গুরুতর আহত হয় ১২ বছরের এক শিশু, পরে তার মৃত্যু হয়। পরদিন ডি হোয়াই সৈকতে ১১ বছরের এক কিশোরের সার্ফবোর্ডে হাঙরের কামড় লাগে। এর কয়েক ঘণ্টা পর কাছের ম্যানলি এলাকায় এক ব্যক্তি আক্রান্ত হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন। ২০ জানুয়ারি উপকূল থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে আরেক সার্ফারের বুকে আঘাত লাগে, যখন হাঙর তার বোর্ডে কামড় দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাগুলোর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে টানা ভারী বৃষ্টি। জানুয়ারিতে কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণে সিডনিতে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এতে বিপুল পরিমাণ মিঠা পানি নদী ও খাল দিয়ে সমুদ্রে নেমে আসে, যা হাঙরের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। বিশেষ করে বুল হাঙর উষ্ণ ও কম লবণাক্ত পানিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে এবং নদীর মোহনা ও মোহনায় ভিড় করে।
এই বৃষ্টির ফলে সমুদ্রে বর্জ্য, পুষ্টি উপাদান ও ছোট মাছের উপস্থিতি বেড়ে যায়। ফলে খাবারের খোঁজে হাঙরও উপকূলের কাছাকাছি চলে আসে। গবেষকদের ভাষায়, এটি ছিল এক ধরনের ‘পারফেক্ট স্টর্ম’, যেখানে পরিবেশগত সব উপাদান একসঙ্গে কাজ করেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে অস্ট্রেলিয়ায় হাঙরের সঙ্গে মানুষের সংঘর্ষের সংখ্যা বেড়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে হাঙর বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। বরং উপকূলীয় জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলক্রীড়ার জনপ্রিয়তা, উন্নত সুরক্ষা পোশাকের কারণে মানুষ আগের চেয়ে বেশি সময় পানিতে থাকছে। পাশাপাশি নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি উন্নত হওয়ায় ঘটনাগুলো এখন বেশি নথিভুক্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, হাঙর দেখা, কাছাকাছি আসা বা হালকা কামড়—সবকিছুকে একসঙ্গে ‘হাঙর আক্রমণ’ হিসেবে উপস্থাপন করলে মানুষের ভয় অযথা বেড়ে যায়। বাস্তবে প্রাণঘাতী ঘটনা তুলনামূলকভাবে খুবই বিরল।
সাম্প্রতিক ঘটনার পর হাঙর নিধনের দাবি উঠলেও বিজ্ঞানীরা এর বিরোধিতা করছেন। তাঁদের মতে, জাল বা ফাঁদ পেতে হাঙর হত্যা করলে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। কারণ হাঙর নির্দিষ্ট কোনো জায়গার প্রাণী নয়; পরিবেশে যদি খাবার বা আকর্ষণ থাকে, অন্য এলাকা থেকেও হাঙর চলে আসবে। গবেষণায় দেখা গেছে, হাঙর নিধন মানুষের ঝুঁকি কার্যকরভাবে কমাতে পারে না।
ঝুঁকি কমাতে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, ভারী বৃষ্টির পর সাঁতার বা সার্ফিং এড়িয়ে চলা, সতর্কতা সংকেত মেনে চলা এবং প্রয়োজনে সুরক্ষিত ঘেরা এলাকায় সাঁতার কাটা। একই সঙ্গে সমুদ্রকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ভাবার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার কথাও বলা হচ্ছে।
গবেষকদের মতে, সমুদ্রও বন্য প্রকৃতির অংশ। এখানে মানুষ অতিথি মাত্র। হাঙর সব সময় বিপজ্জনক নয়, কিন্তু সমুদ্র কখনোই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। তাই সচেতনতা, বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের মানসিকতাই সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা।
















