রংপুর ও ঢাকাকেন্দ্রিক চাপ কমাতে এক হাজার শয্যার বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী হাসপাতালকে কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন প্রধান উপদেষ্টা
নীলফামারীতে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী হাসপাতাল উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার নতুন দিগন্ত খুলে দেবে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, রংপুর ও ঢাকাকেন্দ্রিক বড় হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি, আর এই হাসপাতাল সেই লক্ষ্য অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, নীলফামারীর এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। এই হাসপাতালের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের মানুষ নিজ এলাকায় থেকেই আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)-এর সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের পর এসব কথা বলেন তিনি। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা নিজেই। তার মতে, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ঢাকাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবার চাপ কমবে এবং আঞ্চলিকভাবে স্বাস্থ্যখাতের ভারসাম্য তৈরি হবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উদ্যোগে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে প্রকল্পটি জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ডিসেম্বর ২০২৯ মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে। মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৫৯ দশমিক ৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন ১৭৯ দশমিক ২৭ কোটি টাকা এবং বাকি অংশ চীনের অনুদান সহায়তা হিসেবে আসবে।
গত বছরের মার্চে চীন সফরকালে বাংলাদেশে একটি উন্নতমানের হাসপাতাল স্থাপনের অনুরোধ করেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। তারই ধারাবাহিকতায় চীন সরকার দ্রুত এই প্রকল্পে সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রকল্পের আওতায় নীলফামারী সদর উপজেলায় একটি আধুনিক ১০ তলা হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ডরমেটরি ও আবাসিক ভবন, ডিরেক্টরস বাংলো, প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামো এবং আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে।
এই হাসপাতালে সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি নেফ্রোলজি, কার্ডিওলজি, অনকোলজি, নিউরোলজি প্রভৃতি বিশেষায়িত বিভাগ চালু করা হবে। আধুনিক জরুরি বিভাগ, আইসিইউ, সিসিইউ ও এইচডিইউ, উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং আধুনিক অপারেশন থিয়েটারের মাধ্যমে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে।
প্রধান উপদেষ্টা মনে করেন, এই হাসপাতাল চালু হলে শুধু বাংলাদেশের রোগীরাই নয়, নেপাল ও ভূটানসহ পার্শ্ববর্তী দেশের রোগীরাও এখানে চিকিৎসাসেবা নিতে পারবেন। এতে আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশ স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
হাসপাতালটি চালু হলে রাজস্ব খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ৮৯৩ জন চিকিৎসক, ১ হাজার ১৯৭ জন নার্স এবং ১ হাজার ৪১০ জন অন্যান্য জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যখাতের সক্ষমতা বাড়াবে।
নীলফামারী জেলায় প্রায় ২১ লাখ মানুষের বসবাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী এই জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজন কমপক্ষে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার শয্যা। বর্তমানে জেলায় কার্যকর শয্যা সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় গুরুতর রোগীদের রংপুর বা ঢাকায় যেতে হয়, যা সময়, ব্যয় ও ঝুঁকি বাড়ায়।
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় ও দীর্ঘ ভ্রমণজনিত ভোগান্তি কমবে, সময়মতো জীবনরক্ষাকারী সেবা নিশ্চিত হবে এবং দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
















