রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন ও ডিজিটাল অগ্রগতি
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে নেওয়া সংস্কারগুলো রাজস্ব আদায়, কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এনেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্বকালীন সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সংস্কার, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন, ডিজিটালাইজেশন এবং করের আওতা সম্প্রসারণে একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে রাজস্ব আহরণে গতি এসেছে এবং কর প্রশাসন আরও আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক হয়েছে।
রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পৃথকীকরণ
সরকার ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম আলাদা করেছে। নিকার সভার অনুমোদনের মাধ্যমে রুলস অব বিজনেস ও অ্যালোকেশন অব বিজনেস সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা এনবিআরের কাঠামোগত সংস্কারে বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি
চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই–ডিসেম্বর) এনবিআর রাজস্ব আদায় করেছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ হাজার ২০ কোটি টাকা বেশি। কর ফাঁকি রোধ, পূর্বের বকেয়া কর পুনরুদ্ধার ও কার্যকর মনিটরিংয়ের ফলেই এই অগ্রগতি এসেছে।
অবকাঠামো উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মানের কাস্টমস ব্যবস্থা
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চট্টগ্রামে আধুনিক কাস্টমস হাউস ও কাস্টমস একাডেমি নির্মাণে আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। পাশাপাশি খুলনায় নতুন কর ভবনের নির্মাণ শেষ হয়েছে, যা শিগগিরই উদ্বোধন করা হবে।
কর অব্যাহতি সংস্কৃতি থেকে সরে আসা
টিইপিএমএফ প্রণয়ন করে কর অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষমতা এনবিআর থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন সংসদের অনুমোদন ছাড়া কোনো কর অব্যাহতি দেওয়া যাবে না। আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস আইনের ইংরেজি সংস্করণ গেজেটে প্রকাশ করায় আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা বাড়বে।
ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনা ও ই-পেমেন্ট
ই-রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা, এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড ও আইবাস++ সংযুক্তির মাধ্যমে ব্যাংক ও এমএফএসে বিনা ফিতে কর পরিশোধ, অনলাইন ভ্যাট রিফান্ড ও স্মার্ট চালান চালুর ফলে করদাতাদের ভোগান্তি কমেছে। ইতোমধ্যে ৩৪ লাখের বেশি ই-রিটার্ন জমা পড়েছে।
ভ্যাট ও কাস্টমস খাতে সংস্কার
বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ১.৩১ লাখ নতুন ভ্যাট নিবন্ধন হয়েছে। বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো, ট্র্যাক মুভমেন্ট মডিউল এবং নতুন লাইসেন্সিং বিধিমালা চালুর ফলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সহজ হয়েছে এবং বন্দরে কনটেইনার জট কমেছে।
নিত্যপণ্যে শুল্ক ও কর ছাড়
রমজান সামনে রেখে চাল, আলু, পেঁয়াজ, ডিম, চিনি, ভোজ্যতেল ও তাজা ফলে শুল্ক ও কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হজযাত্রীদের বিমান টিকিটে আবগারি শুল্ক অব্যাহতি এবং মেট্রোরেল সেবায় ভ্যাট ছাড় বহাল রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, নীতিগত সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এনবিআর রাজস্ব ব্যবস্থায় একটি দৃশ্যমান ও টেকসই পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করেছে, যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ পরিবেশ জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
















