বাঙালিসহ গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের রান্নায় মরিচ আজ অপরিহার্য উপাদান। ভর্তা, ভাত কিংবা মাছের ঝোল মরিচ ছাড়া যেন কল্পনাই করা যায় না। বিদেশি খাবারের দেশি রূপ বদলেও দেয় মরিচের ঝাল স্বাদ। তবে অবাক করার বিষয় হলো, মাত্র পাঁচ শতাব্দী আগেও এই অঞ্চলে লাল মরিচের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
তৎকালীন সময়ে ঝালের স্বাদ পেতে মানুষ নির্ভর করত গোলমরিচ, আদা, সরিষা ও রসুনের ওপর। আজ যাকে আমরা গোলমরিচ বলি, সেটিই ছিল উপমহাদেশের প্রধান ঝাল মসলা। পরবর্তীতে পর্তুগিজদের হাত ধরেই লাল মরিচের সঙ্গে পরিচিত হয় এ অঞ্চলের মানুষ।
ইতিহাসবিদরা জানান, মরিচের উৎপত্তিস্থল দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা। বর্তমান মেক্সিকো, পেরু ও বলিভিয়া অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে থেকেই আদিবাসীরা মরিচ চাষ ও ব্যবহার করত। ইউরোপ বা এশিয়ায় তখন মরিচ সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না।
পনেরো শতকের শেষদিকে ইউরোপীয় শক্তিগুলো মসলা বাণিজ্যের দখল নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকায় পৌঁছে ভুল করে ভেবেছিলেন তিনি গোলমরিচের দেশে এসেছেন। সেই ভুল থেকেই ইউরোপে মরিচ পেপার নামে পরিচিত হয়।
ভারতীয় উপমহাদেশে মরিচ আনার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে পর্তুগিজরা। ১৪৯৮ সালে ভাস্কো দা গামা কেরালার কালিকটে পৌঁছান। পরে ১৫১০ সালে আলফোনসো দে আলবুকার্ক গোয়া দখল করেন এবং সেটি পর্তুগিজদের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। ইতিহাস অনুযায়ী, ষোড়শ শতকের শুরুতে পর্তুগিজ নাবিক ও ধর্মযাজকরা আমেরিকা থেকে আনা ক্যাপসিকাম প্রজাতির মরিচের বীজ গোয়ায় রোপণ করেন।
গোয়ার উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া এবং বিশেষ ধরনের মাটি মরিচ চাষের জন্য উপযোগী ছিল। অল্প সময়েই স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে মরিচ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে বাণিজ্যপথ ধরে তা ছড়িয়ে পড়ে কেরালা, তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশে। মুঘল আমলের শেষদিকে দরবারি রান্নাতেও মরিচের ব্যবহার শুরু হয়।
বাংলায় মরিচ আসে আরও কিছুটা পরে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে স্থল ও নদীপথে ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে মরিচ পৌঁছে যায় গঙ্গার বদ্বীপে। পর্তুগিজ, আরাকানি, আরব ও স্থানীয় বণিকদের হাত ধরে বাংলার কৃষিজমিতে মরিচের চাষ শুরু হয়। গোলমরিচের তুলনায় এটি ছিল সস্তা, দ্রুত ফলনশীল এবং বেশি ঝাল হওয়ায় সাধারণ মানুষের রান্নায় দ্রুত জায়গা করে নেয়।
মরিচের আগমনে বাংলার খাদ্যসংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন আসে। মাছের ঝোল, শাক ভর্তা, ডাল ও মাংসের রান্নায় ঝালের নতুন ধারা তৈরি হয়। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য মরিচ হয়ে ওঠে লাভজনক অর্থকরী ফসল।
গবেষকদের মতে, মরিচের বিস্তার উপমহাদেশের মসলা বাজারে নীরব বিপ্লব ঘটায় এবং গোলমরিচের একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে দেয়।
আজ মরিচ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এতটাই অংশ হয়ে গেছে যে এর বিদেশি ইতিহাস প্রায় ভুলে যাই আমরা। অথচ আমেরিকার মাঠ থেকে গোয়ার বন্দর পেরিয়ে বাংলার রান্নাঘরে পৌঁছানো এই মরিচের গল্প আসলে বাণিজ্য, উপনিবেশ এবং স্বাদের দীর্ঘ যাত্রার এক অনন্য দলিল।
















