রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ আখ্যা দিয়ে গণহত্যার দায় এড়াতে অপচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ; ঐতিহাসিকভাবে তারা আরাকানের স্বতন্ত্র নৃগোষ্ঠী বলে উল্লেখ।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উপস্থাপন করে মিয়ানমার যে বক্তব্য দিয়েছে, তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এই প্রচেষ্টা মূলত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার দায় এড়ানোর কৌশল।
শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, মিয়ানমার পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় অস্বীকার করছে। তাদের ‘বাঙালি’ আখ্যা দিয়ে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে চালানো সহিংস অভিযানকে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। অথচ ঐতিহাসিক ও নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত, রোহিঙ্গারা আরাকানের একটি স্বতন্ত্র নৃগোষ্ঠী, যারা ১৭৮৫ সালে বার্মিজ দখলের বহু আগ থেকেই সেখানে বসবাস করে আসছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সমাজ ও রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। এমনকি ২০১৫ সাল পর্যন্ত তারা ভোটাধিকার ভোগ করেছে। পরিকল্পিতভাবে এই জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রহীন করতে তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে দেশ থেকে বিতাড়নের পথ তৈরি করা হয়।
বাংলাদেশ আরও জানায়, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ রাখাইনে আশ্রয় নিয়েছিল—মিয়ানমারের এমন দাবির কোনো দালিলিক ভিত্তি নেই। তৎকালীন রাখাইনের জনসংখ্যার তুলনায় এত বড় অনুপ্রবেশ ঘটলে তা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হতো এবং ব্যাপক আর্থসামাজিক সংকট তৈরি করত।
বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার কিছু মিল থাকলেও তারা একটি পৃথক জনগোষ্ঠী, যাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সামাজিক রীতি রয়েছে। তাদের ‘বাঙালি’ আখ্যা দেওয়া শুধু পরিচয় বিকৃতি নয়, বরং নাগরিকত্ব ও মানবাধিকার কেড়ে নেওয়ার একটি কৌশল।
বাংলাদেশ জানায়, গত আট বছরেও রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যাবাসনের পরিবর্তে কেবল সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে, যা রোহিঙ্গা নির্মূলের অভিপ্রায়েরই প্রতিফলন বলে মনে করছে ঢাকা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও রাখাইনের বর্তমান নিয়ন্ত্রকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের নিজস্ব সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে তাদের টেকসই প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে।
















