যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে এক বছর পূর্তি উপলক্ষে হোয়াইট হাউসে দীর্ঘ সংবাদ সম্মেলন করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবারের এই ব্রিফিংয়ে তিনি অভিবাসন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, ন্যাটো ও জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ থেকে শুরু করে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের সম্ভাবনা পর্যন্ত নানা বিষয়ে কথা বলেন।
ট্রাম্প দাবি করেন, তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছর ছিল “অসাধারণ সময়”। প্রায় এক ঘণ্টা ৪০ মিনিটের এই সংবাদ সম্মেলনে তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে উল্টো অভিবাসনের প্রবণতা ও উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা তুলে ধরেন। তবে ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং গ্রিনল্যান্ডকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়ে তার অবস্থান পুরো আলোচনাকে ছাপিয়ে যায়।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ইউরোপীয় নেতারা যখন জড়ো হচ্ছিলেন, তখন গ্রিনল্যান্ডকে “একভাবে বা অন্যভাবে” যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে আনার হুমকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি করে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির মতো কিছু নেতা এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ছাড়া পশ্চিমা জোটের ভবিষ্যৎ কল্পনার কথাও বলেন।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে হুঁশিয়ারি
সংবাদ সম্মেলনের দিন সকালে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি কিছু ছবি পোস্ট করেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে কানাডা, গ্রিনল্যান্ড ও ভেনেজুয়েলার ওপর দাবি জানাতে দেখা যায়। আরেকটি ছবিতে তাকে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা গেড়ে দিতে দেখা যায়।
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে একাধিক বৈঠক নির্ধারিত আছে এবং তিনি আশাবাদী যে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে যাবে। গ্রিনল্যান্ডবাসীর আত্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি তা এড়িয়ে যান এবং বলেন, তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা খুশিই হবে। তবে দ্বীপটি দখলে নিতে তিনি কতদূর যেতে প্রস্তুত—এমন প্রশ্নে ট্রাম্প শুধু বলেন, “তখনই জানতে পারবেন।”
ন্যাটো ও জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ন্যাটো ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি আছে কি না—এমন প্রশ্নে ট্রাম্প সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, একটি সমাধান সবার জন্যই ভালো হবে। তিনি দাবি করেন, নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন।
ন্যাটো সদস্যদের সামরিক ব্যয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে নিজের ভূমিকার কথা আবারও তুলে ধরেন ট্রাম্প। তবে ন্যাটোর মূল নীতি, অর্থাৎ এক সদস্য আক্রান্ত হলে অন্যরা পাশে দাঁড়াবে—এই বিষয়টি নিয়েই তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র অন্যদের রক্ষা করতে এগিয়ে যাবে কি না, তা নিয়ে তার কোনো সংশয় নেই, কিন্তু ইউরোপ ও কানাডা যুক্তরাষ্ট্রকে একইভাবে সাহায্য করবে কি না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
জাতিসংঘ সম্পর্কেও ট্রাম্প বলেন, সংস্থাটি কখনোই তার পূর্ণ সক্ষমতা দেখাতে পারেনি এবং খুব একটা কার্যকর হয়নি। গাজা পুনর্গঠনের জন্য প্রস্তাবিত তার ‘বোর্ড অব পিস’ ভবিষ্যতে জাতিসংঘের বিকল্প হতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গ
সংবাদ সম্মেলনে ভেনেজুয়েলাকেও গুরুত্ব দেন ট্রাম্প। গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের অনুমোদন দেন তিনি। সেই অভিযানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ট্রাম্প জানান, তিনি এখন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
এর আগে ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর নেতৃত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও এবার ট্রাম্প তার ভূমিকার সম্ভাবনার কথা বলেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ভেনেজুয়েলা থেকে বিপুল পরিমাণ তেল নিয়েছে এবং তা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এর আয় যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত হিসাবে জমা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
মিনেসোটা ও অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা
দেশের ভেতরের রাজনীতিতে মিনেসোটায় বিতর্কিত অভিবাসন অভিযানের পক্ষে অবস্থান নেন ট্রাম্প। সেখানে প্রায় ২ হাজার ফেডারেল এজেন্ট মোতায়েন করা হয়েছে। সোমালি-আমেরিকান সম্প্রদায় নিয়ে আগের মতোই কঠোর ও সমালোচিত বক্তব্য দেন তিনি।
এ ছাড়া মিনিয়াপোলিসে এক মার্কিন নাগরিক নারী রেনি নিকোল গুডের গুলিতে মৃত্যুর ঘটনাতেও প্রতিক্রিয়া জানান ট্রাম্প। তিনি বলেন, ঘটনাটি দুঃখজনক হলেও পরিস্থিতির জন্য উভয় পক্ষই কিছুটা দায়ী। একই সঙ্গে তিনি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের আচরণকে কখনো কখনো কঠোর হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন।
সংবাদ সম্মেলনের শেষে ট্রাম্প নিহত নারীর পরিবারের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন এবং জানান, তিনি আশা করেন, ওই পরিবারের সমর্থন তিনি ভবিষ্যতেও পাবেন।
















