আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা রুখতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বিকল্প নেই
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে আইনের শাসনের বদলে ‘মবতন্ত্র’ বা জনতা কর্তৃক বিচার ব্যবস্থা কুক্ষিগত করার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ধর্মীয় উস্কানি, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত আক্রোশকে কেন্দ্র করে জনতাকে উত্তেজিত করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও ভাঙচুর চালানো হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পতিত স্বৈরাচারের পতনের পর থেকে বিচারব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে দলবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার এই সংস্কৃতি দ্রুত ডালপালা মেলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব ও উস্কানি এই আগুনি ঘৃতাহুতি দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই প্রশাসনিক কঠোরতা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা না গেলে রাষ্ট্র এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি যেখানে মানুষের মতপ্রকাশ ও আইনের শাসন, সেখানে ‘মবতন্ত্র’ হিংস্রতা ও আবেগকে পুঁজি করে ন্যায়বিচারকে ভূলুণ্ঠিত করছে। সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষায়, ভিড়ের মধ্যে ব্যক্তির যুক্তিবোধ বিলুপ্ত হওয়া এবং আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই এই সংকটের মূল কারণ।
মবতন্ত্রের বর্তমান ভয়াবহতা ও প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গ্রাম থেকে শহর—সবখানে মবতন্ত্রের কালো থাবা লক্ষ্য করা যাচ্ছে:
- বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড: চুরির অপবাদ বা তুচ্ছ ঘটনায় গণপিটুনিতে প্রাণ হারাচ্ছেন নিরপরাধ মানুষ। পরে তদন্তে দেখা যাচ্ছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগ ছিল ভিত্তিহীন।
- গুজবের বিস্তার: ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে বিভ্রান্তিকর ভিডিও বা পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষকে উত্তেজিত করে রাস্তায় নামিয়ে আনছে।
- সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উস্কানি: ধর্ম অবমাননার অজুহাতে বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে পরিকল্পিতভাবে মব তৈরি করে জানমালের অপূরণীয় ক্ষতি করা হচ্ছে।
সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি
বিশ্বখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী গুস্তাভ ল্য বঁ তাঁর ‘The Crowd’ গ্রন্থে বলেছিলেন, “একটি ভিড় কখনো যুক্তিবাদী হয় না; ভিড় আবেগ দ্বারা চালিত হয়।” বাংলাদেশে আজ ঠিক সেটাই ঘটছে। দার্শনিক হান্না আরেন্টের মতে, “যখন আইন ভেঙে পড়ে, তখন সহিংসতা নিজেকে ন্যায়ের রূপে উপস্থাপন করতে চায়।” এই তথাকথিত ‘জনতার ক্ষোভ’ আদতে আইনের শাসনকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
মবতন্ত্র নিয়ন্ত্রণে ৫টি জরুরি পদক্ষেপ
সিরাজুল ইসলাম তাঁর নিবন্ধে মবতন্ত্র মোকাবিলায় রাষ্ট্রের জন্য কয়েকটি কঠোর সুপারিশ তুলে ধরেছেন:
১. আইনি কঠোরতা (Zero Tolerance): পরিচয়, ধর্ম বা রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে মবতন্ত্রে জড়িত সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
২. গুজব নিয়ন্ত্রণ: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উস্কানিমূলক কনটেন্ট ও গুজব ছড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল তদারকি জোরদার করা।
৩. প্রশাসনিক সাহসিকতা: পুলিশের নিস্পৃহতা বা রাজনৈতিক চাপ কাটিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
৪. নাগরিক শিক্ষা: শিক্ষাব্যবস্থায় নাগরিক দায়িত্ব ও নৈতিকতা অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে তরুণ প্রজন্ম ভিড়ের অংশ না হয়ে যুক্তিবাদী নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।
৫. আন্তর্জাতিক মডেল অনুসরণ: ভারত বা ইউরোপের মতো ঘৃণাভাষণ ও গণপিটুনির বিরুদ্ধে বিশেষ আইন ও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা।
মবতন্ত্র কোনো সমাজকে নিরাপদ করে না, বরং সবাইকে অনিরাপদ করে তোলে। গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে মবতন্ত্রকে থামানো এখন সময়ের দাবি। আবেগ ও ভিড়ের হাতে ভবিষ্যৎ ছেড়ে না দিয়ে আইন ও বিবেকের পথে রাষ্ট্রকে পরিচালিত করতে হবে।
















