ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যে দেশজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ার পর ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, স্টারলিংক ইরানে বিনা মূল্যে ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছে, যার মাধ্যমে বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের ছবি ও ভিডিও বাইরের বিশ্বে পৌঁছাতে পারছে।
ইরান সরকার বৃহস্পতিবার থেকে দেশটির অনেক এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তথ্য পাঠাতে ইরানিরা প্রক্সি টুলের পাশাপাশি স্টারলিংকের লো-অরবিট স্যাটেলাইট ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন।
স্টারলিংকের ইরানে আনুষ্ঠানিক কোনো লাইসেন্স নেই। তবে ২০২২ সাল থেকে হাজার হাজার স্টারলিংক টার্মিনাল অবৈধভাবে ইরানে ঢুকেছে বলে জানা যায়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে ইরানিদের জন্য যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দেয়। ওই সিদ্ধান্তের পটভূমিতে মাহসা আমিনির হেফাজতে মৃত্যুর পর ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, তিনি ইরানে ইন্টারনেট পুনরুদ্ধারে স্টারলিংকের ভূমিকা দেখতে চান এবং এ বিষয়ে ইলন মাস্কের সঙ্গে কথা বলবেন। যদিও স্টারলিংক বা মাস্ক প্রকাশ্যে বিষয়টি নিশ্চিত করেননি, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটি ইরানে বিনা মূল্যে সেবা দিচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠন ইরান হিউম্যান রাইটসের পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম বলেন, বিক্ষোভ সংক্রান্ত তথ্য, বিশেষ করে নিহতের সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা পেতে স্টারলিংক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তার মতে, বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে বাইরের বিশ্ব কোনো তথ্যই পেত না।
ইরান সরকার এখনো নিহতের কোনো আনুষ্ঠানিক সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তারা জানিয়েছে, শতাধিক নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো দাবি করছে, নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পর থেকে ইরানে অন্তত ১৭ বার ইন্টারনেট বন্ধ বা সীমিত করা হয়েছে। তবে এবারের পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পুরো দেশজুড়ে এবং টানা কয়েক দিন ধরে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
এবার বিব্রতকর নতুন বিষয় হলো, ইরান সরকার স্টারলিংকের সিগন্যাল জ্যাম করার চেষ্টা করছে এবং টার্মিনাল জব্দ করছে। আগের ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনাগুলোতে এমন পদক্ষেপ দেখা যায়নি। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে জব্দ করা স্টারলিংক যন্ত্রপাতির ভিডিও প্রচার করা হয়েছে, যেগুলোকে ‘ইলেকট্রনিক গুপ্তচরবৃত্তির সরঞ্জাম’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
স্টারলিংক কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, এটি পৃথিবীর প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার ওপরে ঘুরে বেড়ানো অসংখ্য স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট সরবরাহ করে। ব্যবহারকারীর কাছে থাকা বিশেষ রিসিভার একের পর এক স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে ইন্টারনেট দেয়। প্রচলিত ভূস্থির স্যাটেলাইটের তুলনায় এটি দ্রুত ও নমনীয় হলেও, একাধিক দিক থেকে সিগন্যাল গ্রহণ করার কারণে জ্যামিংয়ের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন সংকটময় পরিস্থিতিতে স্টারলিংক আগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে এটি বিতর্কের জন্মও দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, কোনো দেশের অনুমতি ছাড়া একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এমন কার্যক্রম রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তোলে।
২০২৩ সালে ইরান এই বিষয়টি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সংস্থায় তোলে। সংস্থাটি ইরানের পক্ষেই রায় দেয় এবং লাইসেন্স ছাড়া স্টারলিংকের কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করে। তবুও চলমান অস্থিরতায় ইরানের ভেতর ও বাইরে তথ্য প্রবাহে স্টারলিংক যে বড় ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে খুব কমই সন্দেহ রয়েছে।
















