দুই দশক ধরে টেলিভিশন শিল্প এগিয়েছে দ্রুত, কিন্তু নীতিমালার অভাবে এর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এখন প্রশ্নের মুখে
১৩ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশে ৫০টির বেশি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল থাকা সত্ত্বেও এখনো পর্যন্ত বেসরকারি টেলিভিশন সম্প্রচারের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা আইন কার্যকর হয়নি। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের মাধ্যমে এসব চ্যানেল পরিচালিত হলেও, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিশ্রুত সম্প্রচার কমিশন বা লাইসেন্সিং কাঠামো গঠিত হয়নি।
প্রশ্ন উঠছে—গণমাধ্যমের উন্মুক্ততা বজায় রাখার নামে রাষ্ট্র কি আসলে একটি অগোছালো, অনিয়ন্ত্রিত শিল্পকে টিকিয়ে রাখছে?
নীতিহীন লাইসেন্স, অস্পষ্ট দায়িত্ব
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৫০টি চ্যানেল অনুমোদন পেয়েছে, কিন্তু সম্প্রচারে রয়েছে মাত্র ৩৬টি। বাকি ১৪টি বছরের পর বছর “প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে” আটকে আছে।
নীতিমালা না থাকায়, একদিকে কেউ লাইসেন্স নিয়ে বিনিয়োগকারী খুঁজছেন, অন্যদিকে কেউ সেটি বিক্রির চেষ্টা করছেন। ফলে “লাইসেন্স ব্যবসা” এখন টেলিভিশন খাতে নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠছে।
একাত্তর টিভির সাবেক কর্মকর্তা মনির হোসেন লিটন বলেন,
“নীতিমালা না থাকায় অনেকেই লাইসেন্স পেয়ে বসে আছেন, কিন্তু বিনিয়োগের অভাবে সম্প্রচারে যেতে পারছেন না। কেউ কেউ মালিকানা বিক্রির চেষ্টা করছেন—এটা শিল্পের জন্য বিপজ্জনক।”
নীতিমালা প্রস্তাব:
২০১৪ সালে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালায় একটি ‘জাতীয় সম্প্রচার কমিশন’ গঠনের কথা বলা হয়েছিল। সেটিই হওয়ার কথা ছিল চ্যানেল লাইসেন্স, কনটেন্ট রেগুলেশন, ও ফ্রিকোয়েন্সি বণ্টনের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিন্তু এক দশক পেরিয়ে গেলেও কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনও প্রস্তাব দিয়েছিল বেসরকারি টিভি লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সংস্কারের—কিন্তু সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি।
সরকারি কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ আলতাব-উল-আলম বলেন, “এ বিষয়ে মন্তব্য করা আপাতত উপযুক্ত নয়।”
কীভাবে টিভি লাইসেন্স দেওয়া হয়?
বাংলাদেশে এখনো টেলিভিশন লাইসেন্স দেওয়া হয় মূলত রাজনৈতিক অনুমোদন ও প্রশাসনিক যাচাইয়ের সমন্বয়ে।
- আবেদনকারীকে জাতীয় পরিচয়পত্র, কর সনদ, ব্যাংক সলভেন্সি ও প্রকল্প প্রস্তাব জমা দিতে হয়।
- যাচাই-বাছাই হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে।
- অনুমোদন মেলে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে, কিন্তু সম্প্রচারের জন্য ফ্রিকোয়েন্সি দিতে হয় বিটিআরসিকে।
একজন সাবেক মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা বলেন,
“বাস্তবে লাইসেন্স পাওয়া অনেকটাই ‘সবুজ সংকেত’ নির্ভর। নীতিমালা না থাকায় নিরপেক্ষ সিদ্ধান্তের কাঠামো নেই।”
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ:
‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নয়, অনিশ্চয়তা’ মিডিয়া পলিসি বিশ্লেষক ও অধ্যাপক সাদিয়া রহমান মনে করেন,
“নীতিমালা না থাকা মানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নয়, বরং একটি অনিয়ন্ত্রিত ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা। এতে ছোট ও নতুন উদ্যোগগুলো সবসময় পিছিয়ে পড়ে।”
তিনি আরও বলেন,
“একই সঙ্গে মালিকানা হস্তান্তর জটিলতা—যেমন লাইসেন্সধারীর ৩০% শেয়ার বাধ্যতামূলক রাখার নিয়ম—চ্যানেলের বাজারচালিত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে।”
আঞ্চলিক তুলনা:
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই ব্যতিক্রম ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা ইতিমধ্যেই টেলিভিশন লাইসেন্সিং ও সম্প্রচার নীতিমালা আলাদা আইনে নিয়ন্ত্রণ করে। ভারতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একটি Broadcasting Content Complaints Council (BCCC) কাজ করে, যেখানে বেসরকারি চ্যানেলগুলোও অংশগ্রহণ করে।
বাংলাদেশে এ ধরনের সংস্থা বা নিরপেক্ষ আপিল কাঠামো নেই। ফলে নীতিমালা না থাকায় টিভি খাতে একদিকে মালিকানার কেন্দ্রীকরণ, অন্যদিকে কনটেন্টে আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব দেখা দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক প্রভাব:
বিনিয়োগ স্থবিরতা ও বাজারের ভারসাম্যহীনতা বিনিয়োগকারীদের মতে, চ্যানেল চালু করতে ৫০–৭০ কোটি টাকা প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। কিন্তু লাইসেন্স পাওয়ার পর সম্প্রচারের সময়সীমা নির্ধারিত না থাকায় প্রকল্প ঝুলে থাকে, ফলে বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা ও বাজার স্থবিরতা তৈরি হয়।
একজন বেসরকারি চ্যানেলের নির্বাহী বলেন,
“চ্যানেল চালুর সময়সীমা নির্ধারণ না থাকায় অনেক লাইসেন্সদাতা শুধু অনুমোদন রেখে দেন—এটি গণমাধ্যম নয়, ব্যবসায়িক পণ্য হয়ে যাচ্ছে।”
আইনহীনতার মাঝে গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ ১৯৯৭ সালে এটিএন বাংলার যাত্রা দিয়ে বাংলাদেশে বেসরকারি টেলিভিশনের যুগ শুরু হয়েছিল। কিন্তু আজ, দ্রুত বর্ধমান এই শিল্পটি এক অদ্ভুত ‘আইনহীন বাস্তবতায়’ দাঁড়িয়ে আছে—যেখানে স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতার সীমারেখা অস্পষ্ট।
যদি সরকার দ্রুত একটি সুনির্দিষ্ট সম্প্রচার নীতিমালা ও লাইসেন্সিং ফ্রেমওয়ার্ক না আনে, তবে বাংলাদেশের টেলিভিশন শিল্প রাজনৈতিক অনুমোদননির্ভর, আর্থিকভাবে অস্থিতিশীল ও কাঠামোগতভাবে অস্বচ্ছ হয়ে থাকবে—যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলার প্রতিচ্ছবি।

















