পাঁচ মাসে টানা মন্দা, কার্যাদেশ কমেছে ৩০–৪০ শতাংশ
রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক চাহিদা সংকোচন ও নীতি সহায়তার ঘাটতিতে এলডিসি উত্তরণের আগে বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশের রপ্তানি
রাজনৈতিক উত্তেজনা, নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা হ্রাসের প্রভাব একসঙ্গে পড়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে। টানা পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি আয় কমছে, আর উদ্যোক্তাদের হিসাবে চলতি মৌসুমে কার্যাদেশ আগের বছরের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নেমে গেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪.২৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯৬ কোটি ডলারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই–ডিসেম্বর) মোট রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ৩৯৯ কোটি ৬৮ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫৪ কোটি ডলার কম।
অক্টোবরে রপ্তানি কমেছিল ৭.৪৩ শতাংশ, নভেম্বরে ৫.৫৪ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে এসে পতনের হার আরও বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, একের পর এক এমন নিম্নমুখী প্রবণতা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি সক্ষমতা ও কর্মসংস্থানের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করছে।
রিজার্ভ দুর্বল হলে জ্বালানি, খাদ্যশস্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বাধা তৈরি হয়, এলসি খোলায় জটিলতা বাড়ে এবং ডলারের দাম বাড়তে থাকে। এর প্রভাব পড়ে উৎপাদন ও বাজারে সরবরাহে—যার অভিজ্ঞতা দেশ ২০২৩ ও ২০২৪ সালেই পেয়েছে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান রয়েছে। রপ্তানি আয় কমে গেলে শুধু কারখানাই নয়, পরিবহন, বন্দর, ব্যাংক ও সেবা খাতেও ধাক্কা লাগে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, আগামী জুন পর্যন্ত পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা খুবই কম। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং পর্যাপ্ত নীতি সহায়তার অভাবে বাংলাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক জানান, যুক্তরাষ্ট্রের রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ, বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তার কারণে তাঁর কারখানায় কার্যাদেশ ১৫–২০ শতাংশ কমে গেছে।
অন্যদিকে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি চাপে পড়েছে। চীন, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার দ্রুত, কম খরচের ও দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে ক্রেতারা সেদিকে ঝুঁকছেন।
এমন বাস্তবতায় এলডিসি থেকে উত্তরণের ঠিক আগমুহূর্তে রপ্তানি খাতের এই টানা পতন বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখনই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল করা, ব্যাংকিং সংস্কার, নীতি সহায়তা জোরদার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না করা গেলে সামনে অর্থনীতিতে আরও বড় ধাক্কা আসতে পারে।
















