চীন সীমান্তে দ্রুত ও কার্যকর সামরিক প্রতিক্রিয়ার লক্ষ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনী ইন্টিগ্রেটেড ব্যাটল গ্রুপ বা আইবিজি গঠনের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের পানাগড়ভিত্তিক সেভেনটিন্থ মাউন্টেন স্ট্রাইক কর্পসকে কেন্দ্র করে এই কাঠামো কার্যকর করা হতে পারে বলে জানিয়েছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
সূত্র অনুযায়ী, চূড়ান্ত সরকারি অনুমোদন মিললে সেভেনটিন্থ কর্পসের দুটি ডিভিশন—৫৯ ডিভিশন ও ২৩ ডিভিশন—থেকে মোট চারটি আইবিজি গঠন করা হতে পারে। প্রতিটি আইবিজির নেতৃত্বে থাকবেন একজন মেজর জেনারেল এবং এতে পাঁচ হাজারের বেশি সেনাসদস্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই কাঠামোয় প্রচলিত ব্রিগেড কমান্ডারের স্তর বাতিল করা হচ্ছে।
সেভেনটিন্থ কর্পস ভারতের চারটি স্ট্রাইক কর্পসের একটি। অন্য তিনটি হলো মথুরাভিত্তিক ফার্স্ট কর্পস, আম্বালাভিত্তিক সেকেন্ড কর্পস এবং ভোপালভিত্তিক টোয়েন্টি ফার্স্ট কর্পস। ২০২১ সাল পর্যন্ত সেভেনটিন্থ কর্পসে একটি ডিভিশন থাকলেও পরে পূর্বাঞ্চলে ভূমিকা জোরদার করতে অন্য কর্পস থেকে একটি অতিরিক্ত ডিভিশন যুক্ত করা হয়।
প্রস্তাবিত প্রতিটি আইবিজি হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিট। এতে থাকবে পদাতিক ব্যাটালিয়ন, আর্টিলারি রেজিমেন্ট, ইলেকট্রনিক্স ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স কর্পস, কমব্যাট ইঞ্জিনিয়ার্স, আর্মি সার্ভিস কর্পস, একটি ফিল্ড হাসপাতাল এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক ইউনিট। প্রয়োজনে এসব আইবিজি কর্পস পর্যায়ের ইউনিট ও অন্যান্য ফরমেশন থেকে অতিরিক্ত লজিস্টিক সহায়তা নিতে পারবে। পাশাপাশি আইবিজিগুলোকে সহায়তার জন্য কর্পস সদর দপ্তরের অধীনে একটি পৃথক ফায়ার সাপোর্ট গ্রুপ গঠনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইবিজির কাঠামো ও উপাদান এখনো চূড়ান্ত নয় এবং বাস্তবায়নের আগে এতে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। এই উদ্যোগটি সেনাবাহিনীর বৃহত্তর পুনর্গঠন কর্মসূচির অংশ, যার মধ্যে রয়েছে ভৈরব ব্যাটালিয়ন, রুদ্র ব্রিগেড, দিব্যাস্ত্র ব্যাটারি ও শক্তিবাণ ইউনিট গঠন। ইতোমধ্যে গঠিত রুদ্র ব্রিগেডগুলোর ধারণা আইবিজির সঙ্গে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ।
আইবিজি ধারণাটি প্রথম উঠে আসে প্রয়াত সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াতের উদ্যোগে গঠিত চারটি বাহিনী পুনর্গঠন সংক্রান্ত গবেষণার একটিতে। প্রায় সাত বছর ধরে এই কাঠামো নিয়ে আলোচনা চললেও এবারই প্রথম এটি পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে। এই ইউনিটগুলোকে নির্দিষ্ট হুমকিভিত্তিক নয়, বরং সক্ষমতাভিত্তিক কাঠামো হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে তারা আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক উভয় ধরনের অভিযানে অংশ নিতে পারে।
এর আগে ২০১৯ সালে পাকিস্তান সীমান্তে নাইনথ কর্পসের অধীনে আইবিজি ধারণা পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়। একই বছর পূর্বাঞ্চলে অনুষ্ঠিত হিমবিজয়সহ একাধিক সামরিক মহড়ায় এই কাঠামো যাচাই করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্য এলাকায় আইবিজি অত্যন্ত কার্যকর, কারণ পুরো একটি কর্পস মোতায়েনের জন্য যে সময় ও জনবল প্রয়োজন, তা ছাড়াই এই ইউনিটগুলো দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে নামানো যায়। একটি পূর্ণ কর্পসে প্রায় এক লাখ সেনা থাকতে পারে, যা মোতায়েনে অনেক বেশি সময় নেয়।
সূত্রগুলো বলছে, আইবিজির মূল শক্তি হলো গতি, নমনীয়তা ও সমন্বিত যুদ্ধক্ষমতা। ভবিষ্যতে থিয়েটার কমান্ড গঠন হলে এই ইউনিটগুলো সরাসরি সেগুলোর অধীনে নির্দিষ্ট অভিযানে ব্যবহৃত হতে পারে।
প্রতিবেদনে চীনের সামরিক পুনর্গঠনের সঙ্গেও তুলনা করা হয়েছে। গত এক দশকে চীন বড় ডিভিশনের বদলে ছোট কিন্তু বহুমুখী কম্বাইন্ড আর্মস ব্রিগেড গঠন করেছে, যেখানে ট্যাংক, আর্টিলারি, আকাশ প্রতিরক্ষা ও সহায়ক ইউনিট একসঙ্গে কাজ করে। ভারতীয় সেনার আইবিজি ধারণাকেও একই ধরনের আধুনিক ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
















