১১ জানুয়ারি ২০২৬: দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে ব্রিকস জোটভুক্ত কয়েকটি দেশের যৌথ নৌ মহড়া শুরু হয়েছে। এতে চীন, রাশিয়া ও ইরানসহ কয়েকটি দেশ অংশ নিলেও জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ভারত ও ব্রাজিল সরাসরি অংশ নেয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকা এই মহড়াকে বৈশ্বিক সমুদ্র নিরাপত্তা ও বাড়তে থাকা সামুদ্রিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছে।
‘উইল ফর পিস ২০২৬’ নামে সপ্তাহব্যাপী এই নৌ মহড়া শনিবার শুরু হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার সাইমনস টাউনে, যেখানে ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের সংযোগস্থল, সেখানে এই মহড়ার নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন। মহড়ার অংশ হিসেবে উদ্ধার অভিযান, সামুদ্রিক আক্রমণ প্রতিরোধ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার অনুশীলন চালানো হচ্ছে।
ব্রিকস জোটের নাম এসেছে এর পাঁচ প্রতিষ্ঠাতা দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার নামের আদ্যক্ষর থেকে। বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকা এই জোটের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছে। তবে এই মহড়ায় ভারত ও ব্রাজিল সরাসরি অংশ না নিয়ে পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় থেকেছে।
মহড়ায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে চীন ও ইরান পাঠিয়েছে ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ, রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পাঠিয়েছে করভেট, আর দক্ষিণ আফ্রিকা মোতায়েন করেছে একটি মাঝারি আকারের ফ্রিগেট। দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ব্রিকস প্লাস কাঠামোর আওতায় অতিরিক্ত কয়েকটি দেশকেও পর্যবেক্ষক হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, এই মহড়া কেবল একটি সামরিক অনুশীলন নয়, বরং অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও ঐক্যের বার্তা। তাদের মতে, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম সুরক্ষায় এমন সমন্বিত উদ্যোগ এখন অপরিহার্য।
এই মহড়া এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকা ও কয়েকটি ব্রিকস দেশের সম্পর্ক বেশ টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ব্রিকস জোটকে একটি সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া-সংশ্লিষ্ট একটি তেলবাহী জাহাজ জব্দ করেছে এবং ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, যা বৈশ্বিক রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত এই মহড়া থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, শুল্ক ইস্যু এবং কৌশলগত সহযোগিতা বিবেচনায় নিয়ে নয়াদিল্লি সামরিক মহড়ায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিকস মূলত একটি অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক জোট, সামরিক জোট হিসেবে এর রূপান্তর ভারতের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
ব্রাজিল মহড়ায় পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকলেও সরাসরি অংশ নেয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্রিকস প্লাসে অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত মতপার্থক্য এতটাই গভীর যে, এই জোটের পক্ষে একটি কার্যকর সামরিক জোটে রূপ নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য এই মহড়া আয়োজন কূটনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইতিমধ্যেই দেশটির সম্পর্ক নানা ইস্যুতে চাপে রয়েছে। এর মধ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা এবং চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ওয়াশিংটনের অসন্তোষ বাড়িয়েছে। দেশটির অভ্যন্তরেও এই মহড়া নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। বিরোধী দলগুলোর মতে, ব্রিকসের কোনো যৌথ সামরিক কাঠামো না থাকা সত্ত্বেও এমন মহড়া দক্ষিণ আফ্রিকাকে আন্তর্জাতিক শক্তির দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ব্রিকস নৌ মহড়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে এটি অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর কৌশলগত অবস্থান তুলে ধরছে, অন্যদিকে ভারত ও ব্রাজিলের অনুপস্থিতি জোটের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
















