তেহরান। ইরানে চলমান গণবিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্যে বাজারের দাবিদাওয়া ও দেশজুড়ে চলা বিদ্রোহের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য টানার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু দাঙ্গাকারীদের সঙ্গে নয়। তার ভাষায়, দাঙ্গাকারীদের কঠোরভাবে দমন করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি বাজার ও এর ব্যবসায়ীদের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে অনুগত অংশগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেন এবং দাবি করেন, রাষ্ট্রবিরোধীরা বাজারকে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারবে না।
তবে বাস্তব চিত্র তার বক্তব্যকে সমর্থন করছে না। তেহরানের ঐতিহাসিক বাজার এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে এবং বিক্ষোভকারীরা রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে, যার মধ্যে সুপ্রিম লিডারকে লক্ষ্য করে স্লোগানও রয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বাজারকে আলাদা করে দেখানোর সরকারি প্রচেষ্টা কার্যকর হয়নি।
খামেনির বক্তব্যের পেছনে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে উৎখাতে বাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল এবং পরবর্তী কয়েক দশক ধরে তারা রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। কিন্তু সেই অতীতের আনুগত্য এখন আর রাজনৈতিক নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।
গত দুই দশকে বাজারের অর্থনৈতিক শক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়েছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও ধর্মীয় বিপ্লবী ফাউন্ডেশনগুলোর প্রতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে বাজার ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। একসময় যে বাজার ছিল শাসকগোষ্ঠীর শক্ত ভিত্তি, এখন তা কাঠামোগত দুর্বলতার শিকার।
বিপ্লবের পরপরই প্রভাবশালী বাজার ব্যবসায়ীরা নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ে। বাণিজ্য, শ্রম মন্ত্রণালয় এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে তাদের প্রভাব ছিল। এর ফলে তারা আমদানি লাইসেন্স, বৈদেশিক বাণিজ্য ও সরকারি বিনিময় হারে সুবিধা পেত এবং বড় মুনাফা অর্জন করত।
নব্বইয়ের দশকে অর্থনৈতিক উদারীকরণের সময় বাজার সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক শক্তিগুলো তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানিকে সমর্থন করে। যদিও কিছু সংস্কার বাজারের স্বার্থের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়, তবু তারা দীর্ঘদিন রাষ্ট্রের ভেতরে প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম হয়। প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির সংস্কার উদ্যোগও বাজারের অবস্থানকে মৌলিকভাবে দুর্বল করতে পারেনি।
২০০৫ সালে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বাজার বড় ধরনের সমর্থন দেয়। কিন্তু তার শাসনামলের অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতি বাজারের শক্তি ক্ষয়ের প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে। তথাকথিত বেসরকারিকরণের নামে বড় বড় রাষ্ট্রীয় সম্পদ আইআরজিসি ও ধর্মীয় ফাউন্ডেশন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায়। সংবিধানের একটি নতুন ব্যাখ্যার মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে সরকারি নয় এমন জনস্বার্থমূলক সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এর ফলে ইরানের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। আইআরজিসি অবকাঠামো, জ্বালানি, ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন খাতে প্রভাব বিস্তার করে। একই সঙ্গে বড় বড় ফাউন্ডেশন বিশাল কর্পোরেট সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। এই শক্তিগুলোর সমন্বয়ে রাষ্ট্রের ভেতরে একটি নতুন প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে, যাদের প্রিন্সিপালিস্ট হিসেবে পরিচিত করা হয়।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাজার ও তাদের ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক মিত্ররা। ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো বিপ্লবের পর বাজার ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে ধর্মঘটের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানায়। পরে আহমাদিনেজাদের কঠোর পারমাণবিক নীতির কারণে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ২০১২ সালের মধ্যে তেল ও ব্যাংকিং খাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিষেধাজ্ঞা এবং সুইফট ব্যবস্থা থেকে বাদ পড়ায় অর্থনীতি চরম চাপে পড়ে।
রাষ্ট্র তখন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে বিকল্প ব্যবস্থার দিকে যায়, যেখানে আইআরজিসির ভূমিকা আরও শক্তিশালী হয়। সীমান্ত ও বন্দর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পণ্য আমদানি বাড়ে এবং নিষেধাজ্ঞাভিত্তিক অর্থনীতি আইআরজিসি ও ফাউন্ডেশনগুলোর আধিপত্য আরও দৃঢ় করে, বাজারকে আরও প্রান্তিক করে তোলে।
রাজনৈতিকভাবেও এর প্রভাব পড়ে। প্রিন্সিপালিস্টরা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ পাকাপোক্ত করে এবং ঐতিহ্যগত ডানপন্থীদের প্রভাব কমে যায়। বাজারের আনুগত্যের বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় প্রভাব পাওয়ার পুরোনো সমঝোতা ভেঙে পড়ে।
বর্তমান বাজার বিক্ষোভ তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের পরিবর্তনের ফল। এটি দেখাচ্ছে, শাসনব্যবস্থার ঐতিহ্যগত ভিত্তিও ধীরে ধীরে ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে। সরকার একসময় বাজারকে স্থিতিশীলতার গ্যারান্টি হিসেবে দেখলেও এখন সেই বাজারই চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
তাত্ত্বিকভাবে সরকার চাইলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে এবং আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর আধিপত্য কমিয়ে বাজারকে আবার কাছে টানতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তা কঠিন। পারমাণবিক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে উত্তেজনা কমার সম্ভাবনা কম এবং আইআরজিসির শক্তি কমানোর ক্ষেত্রে সরকারের আগ্রহও সীমিত। এই পরিস্থিতিতে দমননীতি সরকারের হাতে সবচেয়ে সহজ বিকল্প হিসেবে রয়ে গেছে, যদিও তাতে তাদের একসময়কার সবচেয়ে অনুগত সামাজিক গোষ্ঠী আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
















