আইপিএলে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ায় সম্প্রচার নিষিদ্ধ; টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারত না যাওয়ার সিদ্ধান্ত বিসিবির
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল, তার আঁচ এবার প্রবলভাবে লেগেছে ক্রিকেট মাঠেও। লজিস্টিক বা ব্যক্তিগত কোনো কারণ ছাড়াই বিসিসিআইয়ের নির্দেশে তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) দল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্কে চরম তিক্ততা দেখা দিয়েছে। এর প্রতিবাদে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ভারতে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে আইপিএলের সব ধরনের সম্প্রচার অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করেছে সরকার।

সরকারের কঠোর অবস্থান ও আইপিএল নিষিদ্ধ সোমবার (৫ জানুয়ারি) তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে দেশের সব টেলিভিশন চ্যানেল ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মকে দেওয়া এক জরুরি চিঠিতে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের এই বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের কোনো যৌক্তিক কারণ নেই এবং এটি বাংলাদেশের ক্রীড়াপ্রেমী জনগণকে গভীরভাবে মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ করেছে। আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলের বিশেষ আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকারের উচ্চ মহলের মতে, জাতীয় সম্মানের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। অন্যদিকে, ভারতীয় লোকসভার সদস্য ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিক শশী থারুর বিসিসিআইয়ের এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, “আমরা আসলে কাকে শাস্তি দিচ্ছি? মোস্তাফিজের মতো একজন ক্রীড়াবিদকে রাজনৈতিক সমীকরণে টানা চরম বোকামি।”
নিরাপত্তা শঙ্কা ও বিসিবির অনড় মনোভাব বিসিবি ইতিমধ্যে আইসিসি-কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেখানে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা বড় ধরনের শঙ্কা বোধ করছে। বিসিবির যুক্তি হলো, ভারত যদি একজন পেশাদার লিগ ক্রিকেটারের (মোস্তাফিজ) অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারে, তবে পুরো জাতীয় দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি অর্থহীন। বিসিবি তাদের ম্যাচগুলো নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে শ্রীলঙ্কা বা সংযুক্ত আরব আমিরাতে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিলেও আইসিসি তাতে অসম্মতি জানিয়েছে। এ নিয়ে আইসিসি-র সঙ্গে বিসিবির ভার্চুয়াল বৈঠক হলেও কোনো সমাধান আসেনি। বিসিবি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, জাতীয় স্বার্থ ও খেলোয়াড়দের জানমালের নিরাপত্তার চেয়ে বড় কোনো টুর্নামেন্ট হতে পারে না।
সীমান্ত হত্যা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২২ গজের এই অস্থিরতা আসলে দুই দেশের মধ্যকার গভীর অবিশ্বাসেরই বহিঃপ্রকাশ। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সম্প্রতি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধির ঘটনা সম্পর্ককে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, যা গত পাঁচ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে। এছাড়া দিল্লির বাংলাদেশ মিশনে হামলা এবং আগরতলার কনস্যুলেট ভাঙচুরের ঘটনার পর উভয় দেশের রাষ্ট্রদূতদের পাল্টাপাল্টি তলব ছিল নজিরবিহীন। সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর কিছুটা ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করলেও মোস্তাফিজ ইস্যু সবকিছুকে নস্যাৎ করে দিয়েছে।

বাণিজ্যিক ও সামাজিক প্রভাব রাজনৈতিক এই শীতলতার প্রভাব কেবল ক্রিকেট বা কূটনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৭৫ হাজার মেট্রিক টন কমেছে। রেলপথেও বাণিজ্যের পরিমাণ তলানিতে ঠেকেছে। ভারতের সাথে বাণিজ্যিক এই স্থবিরতা দুই দেশের অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদের মতে, প্রতিবেশী বদলানোর সুযোগ নেই, কিন্তু বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যেই আন্তরিকতার অভাব প্রকট। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, নির্বাচিত কোনো সরকার ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত দিল্লি ও ঢাকার এই সংঘাতময় সম্পর্কের উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাটি আসলে একটি জলজ্যান্ত উদাহরণ যে, বর্তমান সময়ে খেলাধুলা আর রাজনীতির বাইরে নেই।
















