‘দুই বেগমের যুদ্ধ’ থেকে এক নেত্রীর মহাপ্রয়াণ ও অন্যজনের নির্বাসন; কোন পথে আগামীর রাজনীতি?
বেগম খালেদা জিয়ার চিরবিদায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির চার দশকের এক দীর্ঘ ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের যবনিকা পড়ল। ১৯৮০-র দশকে স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে ‘দুই নেত্রী’র উত্থান ঘটেছিল, তাঁদের কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে বাংলাদেশের ভাগ্য। একদিকে খালেদা জিয়ার আপসহীন ইমেজ, অন্যদিকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশল—এই দুই মেরুর দ্বন্দ্বে দেশ দেখেছে গণতন্ত্রের মুক্তি, আবার দেখেছে চরম প্রতিহিংসার রাজনীতি। আজ খালেদা জিয়া কবরে শায়িত আর শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসিত; এই শূন্যতায় বাংলাদেশের দ্বিদলীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ এখন এক নতুন সমীকরণের মুখে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করেছে, দীর্ঘ অসুস্থতা ও কারাবন্দী জীবনের কারণে তাঁর প্রতি জনমনে এক গভীর সহানুভূতি তৈরি হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি জানাজা ছিল না, বরং একটি রাজনৈতিক যুগের প্রতি জনগণের শেষ শ্রদ্ধা।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে চরম বৈরিতা: সম্পর্কের বাঁকবদল
১৯৮২ সালে এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর গৃহবধূ থেকে বিএনপির হাল ধরেন খালেদা জিয়া। প্রায় একই সময়ে নির্বাসন থেকে ফিরে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নেন শেখ হাসিনা। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করলেও ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর থেকেই শুরু হয় ক্ষমতার লড়াই।
- সহনশীলতার যুগ (১৯৯১-২০০১): নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দুই নেত্রীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় ছিল। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে উভয়েই ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন।
- অন্ধকার অধ্যায় (২০০৪): ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা দুই নেত্রীর সম্পর্কে চূড়ান্ত ফাটল ধরায়। এরপর থেকে একে অপরের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রমণ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
- মাইনাস টু ফর্মুলা: ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত সরকারের সময় দুই নেত্রীকেই কারাগারে যেতে হয়, যা তাঁদের দলকে আরও শক্তিশালী ও জনঘনিষ্ঠ করে তোলে।
শাসনামলের সমালোচনা ও মানবাধিকার চিত্র
বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই নেত্রীর শাসনামলেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের একাধিক গুরুতর অভিযোগ ছিল।
- খালেদা জিয়ার শাসন: ২০০১-২০০৬ মেয়াদে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠনের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে সূচনা হয়েছিল, তা দেশ-বিদেশে সমালোচিত হয়।
- শেখ হাসিনার শাসন: টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে বিরোধী মত দমন, গুম ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি চরম আকার ধারণ করে। ২০১৮ সাল থেকে খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী রাখা এবং তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ তাঁর শাসনের পতনের মূল কারণ হিসেবে দেখা হয়।
‘দুই বেগম’ পরবর্তী বাংলাদেশ: নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিএনপি এখন পূর্ণাঙ্গভাবে তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বর্তমানে নেতৃত্বহীন ও ছন্নছাড়া।
- প্রতিদ্বন্দ্বীর পরিবর্তন: আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এখন বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তাদের পুরোনো মিত্র জামায়াতে ইসলামী। ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতি এখন এই দুই শক্তিকে কেন্দ্র করেই মেরুকরণ হচ্ছে।
- তৃতীয় শক্তির চ্যালেঞ্জ: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের কথা থাকলেও বর্তমানে আবারও সেই পুরোনো দ্বিদলীয় ধারাই শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার
খালেদা জিয়া এমন এক সময়ে বিদায় নিলেন যখন তাঁর দল ১৭ বছরের দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে আবারও ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে। তাঁর স্বল্পভাষী ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় অটল থাকার গুণ তাঁকে সমর্থকদের কাছে ‘মাতা’ ও ‘অভিভাবক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, “খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে একটি অধ্যায় শেষ হলো ঠিকই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও দল আগামী নির্বাচনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।”
















