দীর্ঘদিনের রাষ্ট্র ও শিক্ষাব্যবস্থার গাফিলতির ফল বলে মনে করছেন শিল্পীরা
দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিল্পী ও সংগঠনের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। তাঁদের মতে, এটি কেবল সাম্প্রতিক অস্থিরতার ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার পরিণতি।
দেশে সংস্কৃতিচর্চার স্বাধীনতা দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে—এমন উদ্বেগই এখন ঘুরে ফিরে আসছে শিল্পী সমাজের কথাবার্তায়। একসময় শীত এলেই শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বাউল উৎসব, কনসার্ট, নাটক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের দৃশ্য ছিল পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বছরের পর বছর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য কনসার্ট ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে বাউলশিল্পী, ছায়ানট, **উদীচী**সহ সাংস্কৃতিক সংগঠন, সংবাদপত্র অফিস, সাংবাদিক ও শিল্পীদের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রখ্যাত অভিনেতা, নাট্যকার ও পরিচালক আবুল হায়াত বলেন, দেশে শিল্পচর্চার ওপর আঘাত কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটি বাংলাদেশের সংস্কৃতির জন্য সরাসরি হুমকি। তিনি এ বিষয়ে সরকারের কঠোর ভূমিকা এবং নাগরিকদের সচেতন প্রতিরোধের আহ্বান জানান।
ছায়ানট ও উদীচীতে হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই ফরিদপুরে জনপ্রিয় ব্যান্ডশিল্পী জেমস–এর কনসার্ট বহিরাগতদের হামলার মুখে পড়ে। জেমসের মুখপাত্র রুবাইয়াৎ ঠাকুর রবিন এই ঘটনাগুলোকে দেশের চলমান অস্থিরতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
সবশেষ ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে ‘গানে গানে সংহতি সমাবেশ’ আয়োজনের জন্য পুলিশের অনুমতি না দেওয়াকে ঘিরেও শুরু হয় সমালোচনা। এতে সংস্কৃতিচর্চা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে নগরের শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও নাট্যকর্মীরা যৌথ বিবৃতি দেন।
জনপ্রিয় অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন মনে করেন, এটি হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো সামাজিক অবক্ষয় নয়। তাঁর ভাষায়, মানুষের নৈতিকতা ও ভিন্নমতকে সম্মান করার চর্চা দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষয়িষ্ণু। রাষ্ট্র ও শিক্ষাব্যবস্থার গাফিলতির ফলেই আজ এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি সংস্কৃতিচর্চায় বাধা ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ওপর হামলাকে অনাকাঙ্ক্ষিত ও লজ্জাজনক বলে অভিহিত করেন।
এদিকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন আয়োজকরা। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হঠাৎ করে বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়ো হওয়ার প্রবণতা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, সংস্কৃতিচর্চার স্বাধীনতা রক্ষা করা না গেলে সমাজের সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে—যার প্রভাব পড়বে রাষ্ট্র ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর।
















