যুক্তরাজ্যে বাড়তে থাকা তাপমাত্রা এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং এটিই ভবিষ্যতের স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়ে উঠছে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন দেশটির একজন শীর্ষ সরকারি জলবায়ু উপদেষ্টা। একই সঙ্গে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আরও জোরালো প্রস্তুতির আহ্বান জানিয়েছেন।
মেট অফিস জানিয়েছে, ২০২৫ সাল যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হতে যাচ্ছে। বছরের শেষ দিকে মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকলেও গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১০.০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পথে, যা ২০২২ সালের ১০.০৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাজ্যের জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি অধ্যাপক র্যাচেল কাইট বলেন, তথ্যই স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে ভবিষ্যৎ কেমন হতে চলেছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে দেশ কীভাবে নিজেদের প্রস্তুত করবে এবং সহনশীলতা গড়ে তুলবে।
তার মতে, বসন্ত ও গ্রীষ্মজুড়ে দীর্ঘ সময় কম বৃষ্টিপাত ও অস্বাভাবিক উষ্ণতা দেশকে খরা ও দাবানলের ঝুঁকিতে ফেলেছে। যদিও প্রতিবছর তাপমাত্রার স্বাভাবিক ওঠানামা থাকে, বিজ্ঞানীরা একমত যে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনই যুক্তরাজ্যের দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠার প্রধান কারণ।
অধ্যাপক কাইট বলেন, গত কয়েক দশকে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইডের প্রভাবই এখন তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। নির্গমন কমাতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি আরও ঘন ঘন দেখা যাবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এখন অভিযোজনমূলক বিনিয়োগ না করলে ভবিষ্যতে এর আর্থিক ও সামাজিক মূল্য অনেক বেশি দিতে হবে।
মেট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যের ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ ১০টি বছরই হবে গত দুই দশকের মধ্যে। জলবায়ু বিজ্ঞানী অ্যামি ডোহার্টি জানান, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই যুক্তরাজ্যসহ সারা বিশ্বে উষ্ণতার প্রবণতা বাড়ছে এবং আগামী দিনে আরও রেকর্ড ভাঙবে। এক বা দুই দশক আগের স্বাভাবিক আবহাওয়া ভবিষ্যতে তুলনামূলকভাবে শীতল বলে মনে হবে।
মেট অফিসের পূর্বাভাসে ডিসেম্বরের বাকি দিনগুলো তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা ধরেই হিসাব করা হয়েছে। তাই নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও ২০২৫ সালের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এ ক্ষেত্রে এটি হবে চলতি শতাব্দীতে ষষ্ঠবারের মতো বার্ষিক তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড।
মেট অফিসের আরেক বিজ্ঞানী মাইক কেনডন বলেন, উনিশ শতক থেকে সংগৃহীত তথ্যের আলোকে বর্তমান পরিবর্তনগুলো নজিরবিহীন। বসন্ত ও গ্রীষ্মে দীর্ঘ সময় ধরে উষ্ণ আবহাওয়া এই সম্ভাব্য রেকর্ডের ভিত্তি তৈরি করেছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রতিটি মাসই ১৯৬১-৯০ সময়কালের গড়ের চেয়ে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি উষ্ণ ছিল।
যদিও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৫.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল, যা ২০২২ সালের ৪০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রার চেয়ে কম, তবু একাধিক স্বল্পমেয়াদি তাপপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। গ্রীষ্মজুড়ে তাপজনিত স্বাস্থ্য সতর্কতাও জারি করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে গরম দিন ও রাত বৃদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। পাশাপাশি কৃষিখাতেও এর প্রভাব পড়ছে, কারণ ভবিষ্যতে কোন ফসল চাষ করা সম্ভব হবে, তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
কম বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। চলতি বছরের বসন্ত ছিল যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে ষষ্ঠ শুষ্কতম বসন্ত। উষ্ণ আবহাওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে এটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা পরিস্থিতির জন্ম দেয়। গ্রীষ্মকালে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের একাধিক অঞ্চলে আনুষ্ঠানিকভাবে খরা ঘোষণা করা হয়, আর স্কটল্যান্ডের কিছু অংশে দেখা দেয় পানির তীব্র সংকট।
পরবর্তীতে কিছুটা বৃষ্টি হলেও অনেক এলাকায় পানির স্তর এখনো স্বাভাবিকের নিচে রয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, এর প্রভাব শুধু কৃষি নয়, নদী, ভূগর্ভস্থ পানি ও পানীয় জলের প্রাপ্যতার ওপরও পড়ছে।
দীর্ঘ শুষ্ক ও উষ্ণ আবহাওয়া দাবানলের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। এপ্রিলের মধ্যেই যুক্তরাজ্যে দাবানলে পুড়ে যাওয়া এলাকার পরিমাণ নতুন বার্ষিক রেকর্ড গড়ে। পুরো বছরে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমি পুড়ে গেছে, যা ২০১৯ সালের আগের রেকর্ডকে অনেক ছাড়িয়ে গেছে।
দমকল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছরে দাবানলের সংখ্যা অভূতপূর্ব। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন অব্যাহত থাকলে যুক্তরাজ্যে ভবিষ্যতে আরও তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল এবং শীতকালে তীব্র বৃষ্টিপাত ও বন্যার ঘটনা বাড়বে।
বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতিও একই রকম। ইউরোপীয় কপেরনিকাস জলবায়ু পরিষেবার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরটি বিশ্ব ইতিহাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় উষ্ণতম বছর হতে পারে। তবে একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ঐকমত্যও চাপের মুখে পড়ছে, কারণ কিছু বড় জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ তাদের নিট শূন্য নির্গমন লক্ষ্য থেকে সরে আসছে।
















