জিডিপির তুলনায় শিক্ষা ব্যয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ, প্রশ্নে বরাদ্দের ব্যবহার ও জবাবদিহিতা
বাজেট বাড়লেও যোগ্য শিক্ষক, আধুনিক পাঠ্যক্রম ও সমান সুযোগের অভাবে শিক্ষার মানে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি—বলছেন শিক্ষাবিদরা।
বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মানে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই—এমন মূল্যায়ন করছেন শিক্ষাবিদ ও নীতিবিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সমস্যা কেবল অর্থের পরিমাণে নয়; বরং বরাদ্দের সুষম বণ্টন, পরিকল্পনা, মনিটরিং ও জবাবদিহিতার ঘাটতিতেই মূল সংকট।
বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রতি শিক্ষার্থীর পেছনে বার্ষিক ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২২৩ ডলার। তবে এই ব্যয়ের বড় অংশই চলে যায় অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ ও বেতন-ভাতায়। পাঠ্যক্রম সংস্কার, গবেষণা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষণ-পদ্ধতির আধুনিকায়নে বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম, যার প্রভাব সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও স্পষ্ট। UNESCO–এর সুপারিশ অনুযায়ী জিডিপির ৪–৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ব্যয় করছে প্রায় ১.৫–১.৮ শতাংশ। World Bank–এর তথ্যে দেখা যায়, জিডিপির তুলনায় শিক্ষা ব্যয়ে সবচেয়ে কম ব্যয়কারী ১০টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটান ও ভারত এ খাতে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, যোগ্য শিক্ষকের ঘাটতি ও দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থা শিক্ষার মান উন্নয়নের বড় বাধা। অনেক শিক্ষক কারিকুলাম পুরোপুরি না বুঝেই পাঠদান করছেন; গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষক অনুপস্থিতির হার ২০–২৫ শতাংশ পর্যন্ত। University of Dhaka–এর শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষকদের মতে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে কেবল বাজেট বাড়িয়ে ফল পাওয়া সম্ভব নয়।
শহর-গ্রামের বৈষম্যও প্রকট। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রামীণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বড় অংশে নিরাপদ পানি, টয়লেট ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নেই। এতে বিশেষ করে মেয়েশিক্ষার্থীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ঝরে পড়ার হার বাড়ছে। একই সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিতরণে অনিয়ম, দেরি ও ভুল বইয়ের অভিযোগ শিক্ষার ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করছে।
গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগও সীমিত। শিক্ষা বাজেটের ৬০–৭০ শতাংশ বেতন খাতে ব্যয় হলেও গবেষণায় বরাদ্দ থাকে ৫ শতাংশেরও কম। এর ফলে কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা গড়ে উঠছে না। বর্তমানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ—বিশেষ করে স্নাতক ডিগ্রিধারীরাও—না আছে শিক্ষায়, না আছে কর্মে, যা মানবসম্পদ উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ—একটি স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগে বেতন ও গ্রেড কাঠামো উন্নয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রাধিকার, এবং বাজেটের পরিকল্পিত ও সুষম বণ্টন। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ালেও মান বাড়বে না।














