ভারতে ভোটার তালিকা হালনাগাদের তীব্র চাপের মধ্যে অন্তত ৩৩ জন নির্বাচন কর্মকর্তা মারা যাওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব মৃত্যুর মধ্যে অন্তত নয়টি আত্মহত্যা বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র। সমালোচিত বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
উত্তরপ্রদেশের লখনৌয়ের বাসিন্দা হর্ষিত ভার্মা মনে করেন, তাঁর ৫০ বছর বয়সী বাবা বিজয় কুমার ভার্মার মৃত্যু একটি ‘অমানবিক দায়িত্বের’ ফল। পেশায় চুক্তিভিত্তিক সরকারি শিক্ষক বিজয় ভার্মাকে বুথ লেভেল অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে। গত ১৪ নভেম্বর গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করার সময় তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে ১০ দিন পর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়।
নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন কর্মসূচি গত ৪ নভেম্বর ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে শুরু হয়। এতে ঘরে ঘরে গিয়ে যোগ্য ভোটার যুক্ত করা এবং অযোগ্যদের বাদ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় বুথ লেভেল অফিসারদের। এসব কর্মকর্তা মূলত শিক্ষক ও নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মচারী। অভিযোগ রয়েছে, সামান্য ভুল হলে পুরো কাজ নতুন করে করতে হয়, ফলে কাজের চাপ ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক স্পেক্ট ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মসূচি শুরুর পর থেকে সারা দেশে অন্তত ৩৩ জন বুথ লেভেল অফিসারের মৃত্যু হয়েছে। আত্মহত্যাকারীদের অনেকে তাঁদের সুইসাইড নোটে অতিরিক্ত কাজের চাপ ও প্রশাসনিক হুমকির কথা উল্লেখ করেছেন।
লখনৌয়ের আরও কয়েকজন বুথ লেভেল অফিসার জানিয়েছেন, দিনে মাঠপর্যায়ের কাজ শেষে গভীর রাত পর্যন্ত অনলাইনে তথ্য আপলোড করতে হয়। অনেক সময় সার্ভার সমস্যার কারণে ভোর পর্যন্ত জেগে থাকতে হয়। একজন কর্মকর্তা বলেন, দিনে মাত্র দুই ঘণ্টার মতো ঘুমানোর সুযোগ পান তিনি। আরেক কর্মকর্তা জানান, তাঁর ফোন নম্বর প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় রাত-বিরাতে ভোটারদের ফোন আসছে।
উত্তরপ্রদেশে এই কর্মসূচির সময়সীমা দুবার বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে তামিলনাডু ও গুজরাটে কার্যক্রম শেষ হলেও কয়েকটি রাজ্যে তা এখনো চলছে।
এই তালিকা সংশোধন ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র। বিহারে ভোটের আগে চালু হওয়া একই কর্মসূচিতে প্রায় ৪৭ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়ায় বিরোধীরা অভিযোগ তোলে যে, এতে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী একে গণতন্ত্র ধ্বংসের পরিকল্পনা বলে আখ্যা দেন। যদিও সরকার ও নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিহার ও পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে কাজের মধ্যেই কয়েকজন কর্মকর্তা মারা যান। পশ্চিমবঙ্গে একাধিক আত্মহত্যার ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক শিক্ষিকা তাঁর সুইসাইড নোটে নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করে লেখেন, তিনি আর এই অমানবিক চাপ নিতে পারছেন না।
এদিকে নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, এই কাজ স্বাভাবিক এবং অতিরিক্ত চাপের অভিযোগ সঠিক নয়। কমিশনের মুখপাত্র জানান, মৃত্যুগুলো দুঃখজনক হলেও কাজকে অতিরিক্ত বোঝা বলা যায় না। সম্প্রতি কমিশন বুথ লেভেল অফিসারদের পারিশ্রমিক ও প্রণোদনা বাড়ানোর ঘোষণাও দিয়েছে।
তবে নির্বাচন কর্মীদের সংগঠনগুলোর দাবি, যথাযথ প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়াই তাঁদের বিশাল দায়িত্বে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কমিশনের একটি ভিডিও পোস্ট নিয়েও সমালোচনা হয়েছে, যেখানে চাপ কমাতে নাচগানের দৃশ্য দেখানো হয়।
এ অবস্থায় বিভিন্ন আদালতে এই বিশেষ সংশোধন কর্মসূচির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অনেক নিহত কর্মকর্তার পরিবার এখনো সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছে। একজন নিহত কর্মকর্তার ছেলে বলেন, বাবার মৃত্যুর পর অন্তত ক্ষতিপূরণ ও একটি সরকারি চাকরি তাঁদের প্রাপ্য।
এই সংকট ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের মানবিক দিকটি নিয়ে আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।
















