গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের কারণে ২০২৪ সালে আর্থিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা সরকারের তামাক খাত থেকে পাওয়া রাজস্বের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে তামাক কোম্পানিগুলো থেকে রাজস্ব এসেছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা হলেও স্বাস্থ্যব্যয় ও পরিবেশগত ক্ষতি মিলিয়ে সামগ্রিক ক্ষতি এর চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার–পিপিআরসি কার্যালয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকস পরিচালিত গবেষণা উপস্থাপন করা হয়। এতে দেখা যায়, তামাকের কারণে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয়েছে ৭৩ হাজার কোটি টাকার বেশি এবং পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে ১৪ হাজার ৫২৫ কোটি টাকার মতো।
একই অনুষ্ঠানে পিপিআরসির আরেকটি গবেষণা ফল প্রকাশ করা হয়, যাতে দেখা যায় দেশের ১২১টি বিদ্যালয় এলাকায় তামাক বিক্রির বিস্তার উদ্বেগজনক। প্রতিটি বিদ্যালয়ের চারপাশে গড়ে পাঁচটির বেশি তামাকের দোকান রয়েছে। শুধু তাই নয়, বিদ্যালয়ের ১০০ মিটারের মধ্যেই পাওয়া গেছে ৬৬৬টি তামাক বিক্রয়কেন্দ্র। এসব দোকানের বেশিরভাগেই এক শলাকা সিগারেট বিক্রি হয়, যা শিশু ও কিশোরদের কাছে তামাককে সহজলভ্য করে তুলছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ৮৪ শতাংশ দোকানে ফ্লেভার্ড সিগারেট পাওয়া যায় এবং ৭১ শতাংশ দোকানে খোলা অবস্থায় সিগারেট প্রদর্শন করা হয়—তা-ও শিশুদের চোখের সমতলে। অধিকাংশ দোকানে তামাকজাত পণ্য রাখা হয় চকলেট, মিষ্টি ও খেলনার পাশে, যা শিশুদের কাছে তামাককে স্বাভাবিক পণ্য হিসেবে তুলে ধরছে। পাশাপাশি ৬৮ শতাংশ বিক্রয়কেন্দ্রে দৃশ্যমান তামাক বিজ্ঞাপন পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, গবেষণার নতুন তথ্য স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন দ্রুত হালনাগাদ ও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। শিশুদের তামাকের সংস্পর্শ কমাতে বিদ্যালয় এলাকার চারপাশে তামাক বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তার দিকেও তারা ইঙ্গিত দেন।
বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. শারমিন ইয়াসমিন বলেন, শিশুদের প্রতিনিয়ত তামাকের মুখোমুখি হওয়া তাদের সুস্থতার জন্য সরাসরি হুমকি। টেগোর ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ আর্টসের সহযোগী অধ্যাপক সিকদার মো. আনোয়ারুল ইসলাম মনে করেন, বিদ্যালয়ের সামনে সিগারেটের সহজ উপস্থিতি শিশুদের কাছে ধূমপানকে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে তুলে ধরছে।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও পিপিআরসি নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, তামাক একটি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি, যা মোকাবিলায় প্রয়োজন দৃঢ় আইন, কার্যকর কর নীতি এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা। তিনি বলেন, প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত ছাড়া তামাক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
গবেষণা প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়—পয়েন্ট অব সেলে তামাক বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা, এক শলাকা সিগারেট বিক্রি বন্ধ করা, ফ্লেভার্ড সিগারেট নিষিদ্ধ করা, আইন বাস্তবায়ন বাড়ানো এবং বিদ্যালয়ের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।














