ভুটান ১৯৭৪ সালে প্রথম বিদেশি পর্যটকদের জন্য দরজা খুললেও দেশের পশ্চিম সীমান্তের দুর্গম হা ভ্যালি আরও বহু বছর অদৃশ্যই ছিল বাইরের দুনিয়ার কাছে। তিব্বত সীমান্ত ঘেঁষা নিরাপত্তাজনিত কারণে অঞ্চলটি ২০০২ সাল পর্যন্ত বন্ধ ছিল—একটি ‘গোপন উপত্যকা’ ভুটানের ভেতরেই।
ভোর ৫টায় হা ভ্যালির লাখাং কার্পো মঠের আঙিনায় প্রায় শতাধিক মানুষের জড়ো হওয়া। ধূপের ধোঁয়া, সিচুয়ান মরিচ দেওয়া গোলাপি ভাতের পায়েসের গন্ধ, গভীর সুরের স্তব—এরপর হঠাৎ ঢাক, দুঙ্গচেন শিঙা আর বন্দুকের আওয়াজ। এখানে উদযাপিত হচ্ছে আপ চুন্ডু লাপসোয়েল—হা ভ্যালির রক্ষাকর্তা দেবতার নামে ১০ কিমি দীর্ঘ শোভাযাত্রা। ১ নভেম্বরের এ উৎসব ভুটানের দীর্ঘতম চিপদ্রেল এবং একমাত্র উৎসব যেখানে পর্যটকদেরও স্বাগত জানানো হয়, যদিও একে জানেন খুব কম মানুষই।
হা ভ্যালি ভুটানের সবচেয়ে ছোট ও বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলোর একটি, পাহাড়ে মোড়া বনভূমিতে নীল ভেড়া, লাল পান্ডা, তুষার চিতাবাঘ আর গ্লেশিয়াল হ্রদের বাস। গ্রীষ্মে ফুটে ওঠে দেশটির জাতীয় ফুল নীল পপি। বিচ্ছিন্নতার কারণে এখানে বন ধর্মের প্রাচীন আচার এখনো সবচেয়ে শক্তভাবে টিকে আছে। হোমস্টে, পুরোনো লজ, স্থানীয় খাবারের ছোট দোকান—এ অঞ্চলে এখনো বড় কোনো হোটেল চেইনের ছোঁয়া নেই।
স্থানীয় উদ্যোক্তা ফিন নরবুর মতে, “হা এমন এক ভুটান, যেখানে কোনো তাড়া নেই। পুরোনো ভুটান আজও জীবন্ত।”
হা ভ্যালি ভ্রমণের জন্য ভুটানে পর্যটক ভিসা ও দৈনিক সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ফি দিতে হয়। পারো বিমানবন্দর থেকে চেলেলা পাস পেরিয়ে বা থিম্পু হয়ে এখানে যাওয়া যায়। কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী হোমস্টে, হিমবাহ লেক ঘেরা বহু দিনের ট্রেক, সাগালা ট্রেক কিংবা ২৭ কিমি দীর্ঘ মেরি পুয়েনসুম ট্রেইল—হা প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের জন্য ভিন্ন মাত্রা দেয়।
গত কয়েক বছরে গ্রামীণ হোমস্টে নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠায় পর্যটকেরা স্থানীয় পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারেন। এখানে তৈরি হয় বিশেষ পনির ‘ফিলু’ আর ঐতিহ্যবাহী হোয়েন্তে ডাম্পলিং—২৯ উপকরণ দিয়ে বানানো এক ব্যতিক্রমী খাবার।
একটি নতুন ‘হা প্যানোরামা ট্রেইল’ চারটি মঠকে যুক্ত করেছে, যা থেকে পুরো উপত্যকার ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পড়ে। এখান থেকেই শুরু হয় ৪০০ কিমি দীর্ঘ ‘ট্রান্স ভুটান ট্রেইল’। পথে জুনেইদ্রাক হার্মিটেজ, যেখানে সন্ন্যাসিনীরা তিন বছরব্যাপী নীরব ধ্যান করেন।
হা ভ্যালির গভর্নর ঘোষণা করেছেন ২০২৭ সালে ৫ কিমি দীর্ঘ ‘টারগোলা রেড পান্ডা ট্রেইল’ খোলা হবে। দেশে লাল পান্ডার সবচেয়ে বড় সংখ্যা পাওয়া যায় এখানেই।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, যিনি দক্ষিণ হা-র মানুষ, বলেন, “হা ভ্যালি ভুটানের ভেতরই আরেক গুপ্ত স্বর্গ, যেখানে প্রকৃতি, কিংবদন্তি আর বিশ্বাস একসূত্রে মিশে আছে।”
সাংওয়া ক্যাম্পের মতো যাযাবর বিলাসবহুল ক্যাম্পগুলো এখন স্থানীয় সংস্কৃতি ধরে রাখতে এবং ছোট গ্রামগুলোকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করতে কাজ করছে।
উৎসব শেষে রাতের আকাশে চাঁদ ওঠে, পাহাড়ের ছায়া দীর্ঘ হয়, আর উপত্যকার রক্ষক দেবতা আপ চুন্ডুর উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয়—হা এখনো ভুটানের সবচেয়ে নিভৃত, সবচেয়ে রূপকথার মতো অঞ্চল, সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত স্বর্গভূমি।
















