মামা–মামলা নয়, অদৃশ্য রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বিদেশি শক্তির হিসাবেই আটকে আছে তাঁর ফেরার সিদ্ধান্ত
তারেক রহমান নিজেই জানিয়েছেন—দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত তাঁর একার হাতে নেই। মামলার অব্যাহতি ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি ফিরতে পারছেন না? রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিদেশি শক্তির প্রভাব ও অতীত সমঝোতার জটিলতা নিয়ে বিশ্লেষণ।
মায়ের সংকটাপন্ন শারীরিক অবস্থার মধ্যেও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরে আসতে পারছেন না কেন—এই প্রশ্ন ঘিরে সারাদিন রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত ছিল। অবশেষে নিজেই ফেসবুক স্ট্যাটাসে স্বীকার করে বলেন, তাঁর দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত “অবারিত বা একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়”। এই মন্তব্য তীব্র বিতর্ক, জল্পনা ও নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে।
শনিবার বিকেলে গুলশানে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি শুধু বলেন, “তারেক রহমানের স্ট্যাটাসেই সব ব্যাখ্যা আছে।” অন্যদিকে বিকেলেই প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান—সরকার কারও দেশে ফেরায় কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। ফলে নতুন প্রশ্ন উঠছে—তাহলে বাধা ঠিক কোথায়?
২০০৭ সালের সমঝোতা থেকে শুরু
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে আঠারো মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালে বিদেশে যান তারেক রহমান। বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা ও তৎকালীন বিবরণ অনুযায়ী—বিদেশে যেতে হলে তাঁকে রাজনীতি থেকে “দূরে থাকার” একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হয়েছিল। সেই অঙ্গীকারের মেয়াদ কি শেষ হয়েছে—তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না।
মামলার বাধা নেই, নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পন্ন
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ১৫ মাসে তাঁর সব মামলা আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য দুইটি বুলেটপ্রুফ গাড়ি কেনা ও অস্ত্র লাইসেন্সের আবেদনও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ফলে আইনি বা নিরাপত্তাজনিত ‘দৃশ্যমান’ কোনো বাধা নেই।
কিন্তু বিএনপির ভেতরের বিভিন্ন সূত্র বলছে—তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে অন্তত দুইটি প্রভাবশালী দেশের “অনাপত্তির” প্রয়োজন, যা এখনো পাওয়া যায়নি বলে ধারণা করা হয়। কোন দেশ এবং কেন আপত্তি—এটি কেউ প্রকাশ্যে স্বীকার করছে না।
বিদেশি শক্তির রাজনৈতিক হিসাব?
সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন—বাংলাদেশের দুই বড় দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার জন্য “বিদেশ থেকে একটি খেলা চলছে”। এই বক্তব্য, তারেক রহমানের সাম্প্রতিক স্ট্যাটাস এবং বিএনপির নীরবতা—সমস্ত কিছু একত্রে প্রশ্ন তুলছে:
তারেক রহমান কি আন্তর্জাতিক শক্তির রাজনৈতিক হিসাবের অপেক্ষায় রয়েছেন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, বাংলাদেশে বড় সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই আন্তর্জাতিক সমীকরণকে উপেক্ষা করে নেওয়া যায় না।
তিনি বলেন, “এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে যুক্তরাষ্ট্র–ভারতের অবস্থান পরিষ্কার না হলে তারেক রহমান দেশে ফেরার ঝুঁকি নেবেন না।”
“মাইনাস টু” না “মাইনাস ফোর”?
১/১১–এ যে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার কথা শোনা গিয়েছিল—সেটি আসলে দুই রাজনৈতিক পরিবারের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে সীমিত করার প্রচেষ্টা ছিল। আজকের বাস্তবতায় শেখ হাসিনা কার্যত রাজনীতির বাইরে; খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ। বিশ্লেষকদের মতে এখন প্রশ্ন—তারেক রহমানকে ফিরতে না দেওয়ার চাপ কি নতুন ধরনের ‘মাইনাস ফোর’ কৌশলকে ইঙ্গিত করছে?
দলীয় অবস্থান
বিএনপির কয়েকজন নেতা ইঙ্গিত দিয়েছেন—নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হলে “পরিস্থিতি যেমনই হোক” তারেক রহমান দেশে ফেরবেন এবং নেতৃত্ব দেবেন। তবে তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে স্পষ্ট বলা হয়েছে—বিষয়টি শুধুই তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয় এবং “স্পর্শকাতরতার কারণে” ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা আছে।
মায়ের শারীরিক সংকটের মধ্যেও অনিশ্চয়তা
খালেদা জিয়া বর্তমানে সিসিইউতে সংকটাপন্ন। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই আহ্বান জানিয়েছেন—এই মুহূর্তে তাঁকে মায়ের পাশে দাঁড়ানো উচিত। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা, অদৃশ্য চাপ ও আন্তর্জাতিক হিসাব তাঁর ফেরার পথকে আরও জটিল করে তুলেছে।
নিরাপত্তা, মামলা বা সরকারের বাধা নয়—তারেক রহমানের দেশে ফেরা এখন পুরোপুরি একটি রাজনৈতিক–আন্তর্জাতিক সমীকরণের ওপর নির্ভর করছে। সে সমীকরণ কখন পক্ষে যাবে—তা এখনো অনিশ্চিত।
















