বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ যখন দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে সাত মাস পর প্রথমবারের মতো বিটকয়েনের দাম নব্বই হাজার ডলারের নিচে নেমে আসে। সোমবারের গভীর পতন যেন পুরো বছরের অর্জন মুছে দিয়ে নতুন এক অনিশ্চয়তার কুয়াশা ছড়িয়ে দেয় ক্রিপ্টো দুনিয়ায়।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের বাজার খোলার পর কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেও ক্ষত তখনই গভীর হয়ে গেছে। অক্টোবরের এক লাখ ছাব্বিশ হাজার ডলারের শিখর থেকে প্রায় ত্রিশ শতাংশ নিচে নেমে এসেছে এই ডিজিটাল মুদ্রা। ইউরোপীয় বাজারে বিটকয়েনের দাম স্থির হয় প্রায় একানব্বই হাজার ডলারে, তবে দিনের শুরুতে তা নেমে গিয়েছিল আটানব্বই হাজারেরও নিচে।
গত ছয় সপ্তাহে পুরো ক্রিপ্টো বাজার থেকে ঝরে গেছে প্রায় এক দশমিক দুই ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ। বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদ কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ এবং দীর্ঘদিনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার পর বৈশ্বিক বাজারে ছড়ানো ভয়ই এই ধসের মূল সুর।
হংকং ওয়েব থ্রি অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি জোশুয়া চু জানালেন, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠান সাম্প্রতিক উত্থানে বড় অঙ্কে বিনিয়োগ করেছিল। এখন সেই অবস্থান থেকে তারা হঠাৎ সরে যাওয়ায় বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, যেন ডমিনোর মতো এক বিক্রি আরেক বিক্রির জন্ম দিচ্ছে।
এদিকে নিয়ন্ত্রক পরিবেশ অনুকূল হবে এই আশায় যারা আগে ক্রিপ্টোতে বিনিয়োগ করেছিলেন, তারাও পিছু হটতে শুরু করেছেন। বিভিন্ন বিনিয়োগ তহবিল এবং লেনদেনভিত্তিক ফান্ড থেকে টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এনিগমা সিকিউরিটিজের জোসেফ এডওয়ার্ডস বলেন, “বিক্রি খুব অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু কেনার দিকটা এখন খুব দুর্বল। গত মাসের আকস্মিক ধস অনেক খুচরা বিনিয়োগকারীকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে।”
ক্রিপ্টো খাতের বড় নামগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। মুদ্রা সংরক্ষণে আগ্রহী স্ট্র্যাটেজি থেকে শুরু করে রায়ট প্ল্যাটফর্মস, মারা হোল্ডিংস এবং এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান কয়েনবেস—সবাই নিম্নমুখী স্রোতে ভেসে যাচ্ছে।
এ বছর একদল ছোট প্রতিষ্ঠান নিজেদের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ক্রিপ্টো যুক্ত করে বাজারে আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, বিটকয়েনের দাম নব্বই হাজার ডলারের নিচে নামলে এসব কোম্পানির অর্ধেকের সম্পদই ‘আন্ডারওয়াটার’ হয়ে যেতে পারে, অর্থাৎ যেদামে কিনেছিল তার চেয়ে বর্তমানে মূল্য কম।
তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর হাতে রয়েছে মোট বিটকয়েনের প্রায় চার শতাংশ এবং ইথারের তিন দশমিক এক শতাংশ। অথচ ইথার নিজেও স্থির নেই—আগস্টের প্রায় পাঁচ হাজার ডলারের চূড়া থেকে এখন তা হারিয়েছে মূল্যমানের প্রায় চল্লিশ শতাংশ।
অ্যাস্ট্রোনট ক্যাপিটালের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ম্যাথিউ ডিব্ব বলেন, “অক্টোবরের লিভারেজ বিস্ফোরণের পর থেকেই ক্রিপ্টো বাজারে মনোভাব খুব নিচে। মানুষের আস্থা যেন কোথাও গিয়ে হারিয়ে ফেলেছে।”
বাজার পুনরুদ্ধারের আভাস দেখা দিলেও প্রশ্ন রয়ে যায়—এই ডিজিটাল স্বপ্ন আবারও সোনালি আলোয় ভরবে, নাকি অনিশ্চয়তার গহ্বরে ডুবে যাবে আরও গভীরে?
















