ভারতের রাজধানী দিল্লির রেড ফোর্টের কাছে ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছে শহর। তবুও, এবার যেন কিছুটা ভিন্ন ভারতের প্রতিক্রিয়া। আগে যেখানে এমন ঘটনায় মুহূর্তেই পাকিস্তানের দিকে আঙুল তুলত নয়াদিল্লি, এবার তারা থেমে আছে—অপেক্ষা করছে, যাচাই করছে, হয়তো ভাবছে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে যেন আরেকটি যুদ্ধের আগুন না জ্বলে ওঠে।
এই নীরবতা আসলে এক আত্মসংযমের গল্প। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেওয়া আগের এক ঘোষণা—“যে কোনো ভবিষ্যৎ সন্ত্রাসী হামলাকে যুদ্ধের কাজ হিসেবে ধরা হবে”—এখন যেন ভারতের কাঁধে বেড়ে বসেছে এক ভারী দায়। কারণ, দিল্লির বিস্ফোরণকে যদি সরকার প্রকাশ্যে “সন্ত্রাসী হামলা” বলে ঘোষণা করে, তাহলে জনমনে জেগে উঠবে প্রতিশোধের দাবি, যুদ্ধের প্রত্যাশা, এবং হয়তো সীমান্তের ওপার থেকে আরেক দফা আগুনের শিখা।
গত মে মাসে কাশ্মীরের পাহালগামে ২৫ পর্যটকের মৃত্যুতে ভারত দোষ দিয়েছিল পাকিস্তানকে। তারপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই আকাশপথে পাল্টা হামলা চালিয়ে দুই দেশ এক ক্ষণস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এরপর ঘোষিত হয় যুদ্ধবিরতি, কিন্তু মোদির “যুদ্ধের সমান প্রতিক্রিয়া” নীতি এক নতুন সীমারেখা টেনে দেয় ভারতের কূটনীতিতে।
এবার রেড ফোর্টের বিস্ফোরণে অন্তত ১৩ জন নিহত এবং বহু আহত হয়েছেন। তদন্তে নেমেছে ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ), যা সাধারণত সন্ত্রাসবিরোধী মামলার তদন্তে যুক্ত থাকে। প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছেন, “দোষীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না, তাদের ন্যায়বিচারের মুখোমুখি করা হবে।”
কিন্তু তার এই ঘোষণা সত্ত্বেও, সরকার এখনো প্রকাশ্যে পাকিস্তানের নাম নেয়নি। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হামলার সূত্রপাত হয়তো কাশ্মীর থেকে, এবং এতে পাকিস্তানভিত্তিক জইশ-ই-মোহাম্মদের ছায়া থাকতে পারে। তবে অভিযুক্তদের অধিকাংশই স্থানীয় এবং স্ব-উদ্দীপ্ত তরুণ, যারা নিজেরাই পরিকল্পনা করেছিল বিস্ফোরণের।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের বর্তমান সংযম আসলে তার নিজের তৈরি এক কূটনৈতিক ফাঁদ। দক্ষিণ এশিয়া সন্ত্রাস বিশ্লেষণ কেন্দ্রের পরিচালক অজয় সাহনি বলেন, “ভারত এখন নিজের কথার ভারে নত। যখন প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, সন্ত্রাসই যুদ্ধ, তখন কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি—এখন সেই কথার বাস্তব পরিণতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।”
দিল্লির বিস্ফোরণের কয়েক ঘণ্টা আগে কাশ্মীর পুলিশের অভিযানে উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক দ্রব্য। দুইজন কাশ্মীরি চিকিৎসককে গ্রেফতার করা হয়, আরেকজন, ডা. উমর নাবি, এখনো পলাতক। ধারণা করা হচ্ছে, বিস্ফোরিত গাড়িটি তিনিই চালাচ্ছিলেন।
কিন্তু এবার ভারতের প্রতিক্রিয়া অনেক হিসেবি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, “ভারত জানে, যদি এই হামলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসবাদ ঘোষণা করা হয়, তাহলে দেশজুড়ে সামরিক প্রতিক্রিয়ার দাবি উঠবে। সরকারের ওপর চাপ বাড়বে কিছু ‘বড় কিছু’ করার।”
আন্তর্জাতিক চাপও এখন ভারতের চিন্তার কারণ। মে মাসের পাল্টা হামলার সময় ভারত প্রমাণ দিতে পারেনি যে পাকিস্তান সরাসরি যুক্ত ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক মহল তখন ভারতের সমর্থন ধরে রাখতে পারেনি। এবার নয়াদিল্লি সেই ভুল আর করতে চায় না।
কাশ্মীরি বিশ্লেষক শেখ শওকত বলেন, “ভারত এখন বুঝেছে, যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়, বরং সবাইকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে। এবার তারা আরও সংযত, আরও কৌশলী।”
অন্যদিকে, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বিস্ফোরণের পর প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সঙ্গে সঙ্গেই ভারতের দিকে অভিযোগের তীর ছুড়েছেন—“এটি ভারতের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নমুনা।” ভারত অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
এই দুই প্রতিবেশীর টানাপোড়েনের মাঝেই আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠছে। একসময় তালেবান ছিল ইসলামাবাদের মিত্র, এখন তারা ভারতমুখী, যা পাকিস্তানের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, মে মাসে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি তার কূটনৈতিক সাফল্যের ফল। এখন দুই দেশই সেই সমঝোতা রক্ষা করতে চাইছে, যেন ট্রাম্পের ক্রোধ না ডাকে নতুন কোনো সংকট।
নয়াদিল্লি-ভিত্তিক বিশ্লেষক হর্ষ পান্ত মনে করেন, “ভারতের কৌশল বরাবরই সংঘাত এড়িয়ে চলা। দেশটি এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নেই মনোযোগ দিতে চায়। যুদ্ধ মানে বিপুল ক্ষতি, অর্থনীতি ও কৌশল—দুই দিকেই।”
তবে পান্তের মতে, এবার সরকারের সংযমের কারণ কেবল কূটনীতি নয়, গোয়েন্দা সাফল্যও। বিস্ফোরণের আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রেফতার হওয়ায় সরকার হয়তো দাবি করতে পারে যে বড় ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করা গেছে। “এটি হয়তো পরিকল্পিত হামলা ছিল না, বরং এক দুর্ঘটনা,” বলেন তিনি।
ভারত এবার তাই যুদ্ধের ভাষায় নয়, বরং সংযমের নীতিতে কথা বলছে—এক জাতি, যে আগুনে পুড়ে বুঝেছে, প্রতিশোধ নয়, প্রজ্ঞাই বাঁচায় দেশকে।
















