সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনযাপনের জন্য হাঁটা, দৌড়ানো কিংবা সাইকেল চালানোর মতো হৃদ্যন্ত্রকেন্দ্রিক ব্যায়ামের গুরুত্ব অনেক। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু দীর্ঘজীবন নয়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভালোভাবে বাঁচতে চাইলে শক্তিবর্ধক ব্যায়ামও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক মানুষ নিয়মিত হাঁটেন, দৌড়ান কিংবা অন্যান্য শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। কিন্তু পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামকে এখনো অনেকেই গুরুত্ব দেন না। অথচ গবেষণা বলছে, শরীরের শক্তি ও কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা একেবারেই কোনো ধরনের শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করেন না, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাই নতুনদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শুরু করা। ব্যায়াম শুরুর জন্য জিমে যাওয়া বা দামি সরঞ্জাম কেনা বাধ্যতামূলক নয়।
প্রথমদিকে সপ্তাহে দুই দিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট করে ব্যায়াম করাই যথেষ্ট। এতে ধীরে ধীরে শরীর শক্তিশালী হতে শুরু করে এবং দৈনন্দিন কাজ সহজ হয়ে যায়।
শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের মধ্যে বসা থেকে উঠে দাঁড়ানো, স্কোয়াট, সিঁড়িতে ওঠানামা, লাঞ্জ, দেয়ালে ভর দিয়ে পুশ-আপ, বুক ও কাঁধের ব্যায়াম, টানধর্মী ব্যায়াম এবং প্ল্যাঙ্ক বিশেষভাবে উপকারী। এসব ব্যায়াম শরীরের বিভিন্ন অংশকে সক্রিয় করে এবং সামগ্রিক শক্তি বৃদ্ধি করে।
শুরুর দিকে শরীরের নিজের ওজন ব্যবহার করেই ব্যায়াম করা যায়। পরে প্রয়োজন হলে পানিভর্তি বোতল, খাদ্যসামগ্রীর ক্যান বা হালকা ওজন ব্যবহার করা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই ঘরের সাধারণ জিনিসপত্র ব্যায়ামের সরঞ্জাম হিসেবে কাজ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা শরীরের বড় পেশিগুলোকে সক্রিয় করে এমন ব্যায়ামের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন। স্কোয়াট, বুকের ব্যায়াম এবং ওজন তুলে ওঠা-নামার ব্যায়াম পুরো শরীরকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি কাঁধ ও পিঠের ব্যায়ামও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো শরীরের ভঙ্গি ঠিক রাখতে এবং পিঠের ব্যথা প্রতিরোধে সহায়তা করে।
ব্যায়াম নিয়মিত করতে থাকলে শরীর ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তখন একই ব্যায়াম সহজ মনে হলে পুনরাবৃত্তির সংখ্যা বা ওজন সামান্য বাড়ানো যেতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ফল পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত চাপ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়াই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে মাত্র ৩০ থেকে ৬০ মিনিট শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করলে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি ১০ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে ৯০ মিনিট থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত এই ধরনের ব্যায়াম করলে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি আরও কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদ্যন্ত্রকেন্দ্রিক ব্যায়াম মানুষকে দীর্ঘজীবী হতে সাহায্য করে, আর শক্তিবর্ধক ব্যায়াম সেই দীর্ঘ জীবনকে আরও সক্রিয় ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তোলে। তাই সর্বোত্তম ফল পেতে দুই ধরনের ব্যায়ামের সমন্বয় প্রয়োজন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের উপকারিতা আরও বেশি স্পষ্ট হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যেও নিয়মিত ওজনভিত্তিক ব্যায়াম মৃত্যুঝুঁকি কমাতে এবং দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স হওয়ার আগেই অতিরিক্ত পেশিশক্তি তৈরি করা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ের মতো। অসুস্থতা, আঘাত, অস্ত্রোপচার বা বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা দেখা দিলে এই শক্তির ভাণ্ডার শরীরকে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করে।
শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও শক্তিবর্ধক ব্যায়াম উপকারী। নিয়মিত ব্যায়াম মানসিক চাপ কমায়, উদ্বেগ হ্রাস করে এবং মনকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, এমন ব্যায়াম বেছে নিতে হবে যা সহজে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে, কাজের ফাঁকে বা ঘরের কাজের সময়ও ছোট ছোট ব্যায়াম করা সম্ভব।
















