আফগানিস্তানের মধ্যাঞ্চলের দাইকুন্দি প্রদেশের কয়েকটি গ্রামে সম্প্রতি কৃষকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেশটির বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিয়ে হতাশাজনক এক বাস্তবতা সামনে আসে। কৃষি খাতে কাজ করা একটি সংস্থার প্রকল্পের সুফল যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকদের জন্য নির্মিত শূন্য-শক্তি সংরক্ষণাগার বাস্তবে গ্রামের অল্প কয়েকটি পরিবারের ফসল রাখার উপযোগী। ফলে গাছের নিচেই বিপুল পরিমাণ আপেল পচে নষ্ট হচ্ছে।
আরেকটি গ্রামে ভিন্ন একটি সংস্থার প্রকল্প নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কৃষকেরা। ওই সংস্থা বিদেশি সবজির বীজ বিতরণ করে প্রশিক্ষণ ও তদারকির জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিল। কিন্তু ফলন ছিল খুবই কম এবং নিম্নমানের। কৃষকেরা সময়, শ্রম, জমি ও পানি ব্যয় করলেও তাদের আর্থিক লাভ ছিল সামান্য। ক্ষতির দায়ও কেউ নেয়নি।
এ ধরনের ঘটনা আফগানিস্তানের গ্রামীণ অঞ্চলে নতুন নয়। বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা তাদের সাফল্যের বিবরণ প্রকাশ করলেও বাস্তবে অনেক প্রকল্প স্থানীয় মানুষের প্রকৃত চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ব্যয় হচ্ছে বিপুল অর্থ, কিন্তু সুফল মিলছে খুবই সীমিত।
তালেবান ক্ষমতায় আসা এবং বিদেশি সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানে মানবিক সহায়তা ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কিন্তু অর্থসংকট সত্ত্বেও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি তেমনভাবে বাড়েনি।
আফগানিস্তানে বিদেশি সহায়তার অপচয়ের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ২০০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশটি দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও সহায়তা অপচয়ের অন্যতম উদাহরণে পরিণত হয়েছিল। বিভিন্ন তদন্তে দেখা গেছে, বিপুল পরিমাণ অর্থ অনিয়ম ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে নষ্ট হয়েছে।
উন্নয়ন খাতের এই সংকট শুধু আফগানিস্তানের নয়; বিশ্বের অনেক দেশেই একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। তবে আফগানিস্তানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, তদারকির সীমাবদ্ধতা এবং মাঠপর্যায়ের জটিলতার কারণে সমস্যাটি আরও প্রকট।
অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা সরাসরি প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে অংশীদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করে। আবার সেই প্রতিষ্ঠানগুলোও উপঠিকাদার নিয়োগ দেয়। ফলে দীর্ঘ এই শৃঙ্খলে মান নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর তদারকি দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের গুণগত মানের চেয়ে লাভের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়।
এ ছাড়া প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরির সময় বাস্তব চাহিদার পরিবর্তে অর্থদাতাদের আকৃষ্ট করার বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়। ফলে কাগজে-কলমে আকর্ষণীয় হলেও প্রকল্পগুলো মানুষের জীবনে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারে না।
বিদেশি কর্মীদের উচ্চ বেতনও ব্যয়ের বড় একটি অংশ। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে কম খরচে একই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হলেও আন্তর্জাতিক কর্মীদের জন্য কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত ব্যয় করা হয়।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থায়ন সংকট উন্নয়ন খাতের জন্য আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। আফগানিস্তানের মতো দেশে, যেখানে প্রয়োজন ব্যাপক কিন্তু অর্থ সীমিত, সেখানে উন্নয়ন সংস্থাগুলোর উচিত স্থানীয় দক্ষ জনবলকে পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া। স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে তাদের জ্ঞান প্রকল্পকে আরও কার্যকর ও সাশ্রয়ী করতে পারে।
একই সঙ্গে অংশীদার ও উপঠিকাদারের দীর্ঘ শৃঙ্খল কমানো, নিয়মিতভাবে স্থানীয় জনগণের মতামত সংগ্রহ করা এবং প্রকল্প চলাকালে ফলাফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
বেকারত্ব, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাজারে প্রবেশাধিকারের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর সমাধানে বিনিয়োগ করলে প্রকল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদি সুফল দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে পারলে শুধু আফগান জনগণই বেশি উপকৃত হবে না, বরং সীমিত অর্থায়নের প্রতিযোগিতায় উন্নয়ন সংস্থাগুলোও টিকে থাকার সুযোগ পাবে। আফগানিস্তানসহ বিশ্বের উন্নয়ন খাতকে টেকসই করতে এ ধরনের পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।
















