দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাবের ভিত্তি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা। নিরাপত্তা সহায়তার বিনিময়ে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো তেল বিক্রিতে শুধুমাত্র ডলারের ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং সেই আয় পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডে বিনিয়োগ করত। এই ব্যবস্থাই পেট্রোডলার কাঠামো হিসেবে পরিচিত, যা ডলারের জন্য স্থায়ী বৈশ্বিক চাহিদা তৈরি করে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে সহজে ঋণ গ্রহণ ও ব্যয় করার সুযোগ দেয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। ইরানকে ঘিরে সংঘাত কেবল জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথকে অস্থিতিশীল করেনি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নির্ভরতার বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এর ফলে ধীরে ধীরে পেট্রোইউয়ানভিত্তিক নতুন আর্থিক কাঠামোর উত্থান দেখা যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালী, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়, সেখানে এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ইউয়ানে লেনদেনের শর্ত আরোপ করছে। এতে চীনের জাহাজগুলো সহজে চলাচল করলেও পশ্চিমা দেশের জাহাজগুলো নানা জটিলতার মুখে পড়ছে। এই পদক্ষেপ ভৌগোলিক অবস্থানকে ব্যবহার করে আর্থিক পরিবর্তন চাপিয়ে দেওয়ার একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে তিনটি বড় কারণ কাজ করছে। প্রথমত, অর্থনৈতিক ভারসাম্যের পরিবর্তন। সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা এখন চীন এবং উপসাগরীয় তেলের বড় অংশই যাচ্ছে এশিয়ায়। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো। সৌদি আরব ইতোমধ্যে ইউয়ানে লেনদেনের সক্ষমতা তৈরি করেছে এবং চীনের সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় চুক্তি করেছে। তৃতীয়ত, নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা। উপসাগরীয় দেশগুলো মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা দিতে পারছে না।
পেট্রোডলার ব্যবস্থার ফলে এতদিন বিশ্বে তেলের চাহিদা মানেই ছিল ডলারের চাহিদা। আর ডলারের প্রয়োজন মানেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর নির্ভরতা। এতে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। কিন্তু এখন বিকল্প ব্যবস্থার উত্থান সেই প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে।
রাশিয়া ইতোমধ্যে চীনের কাছে ইউয়ানে জ্বালানি বিক্রি করছে। ভারতও ইরান ও রাশিয়া থেকে তেল কিনছে ইউয়ানে। পাশাপাশি নতুন ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে উঠছে, যা ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে লেনদেনের সুযোগ দিচ্ছে।
তথ্য বলছে, বৈশ্বিক মুদ্রা সংরক্ষণে ডলারের অংশ ১৯৯৯ সালের ৭১ শতাংশ থেকে কমে এখন প্রায় ৫৭ শতাংশে নেমেছে। এটি হঠাৎ পতন নয়, বরং ধীরগতির পরিবর্তন, যা সময়ের সঙ্গে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ডলারের অবস্থান এখনও শক্তিশালী। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বাজার গভীর ও স্থিতিশীল, যা অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে এখনো সমান নয়। আন্তর্জাতিক লেনদেনের বড় অংশ এখনও ডলারে হয়। চীনের মুদ্রা এখনো বৈশ্বিক রিজার্ভে সীমিত অংশ জুড়ে আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো একক মুদ্রার পরিবর্তে বহুমুখী মুদ্রা ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত। ভবিষ্যতে ডলার, ইউয়ান, ইউরোসহ একাধিক মুদ্রা সমান্তরালভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।
এই পরিবর্তনের ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে চাইছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি বাদ দিচ্ছে না, বরং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বিকল্প পথ তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। শুধু চাপ প্রয়োগ করে বা শুল্ক বাড়িয়ে এই পরিবর্তন থামানো সম্ভব নয়। কারণ এই পরিবর্তনের মূল কারণ আস্থার সংকট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেট্রোডলার থেকে পেট্রোইউয়ানে রূপান্তর একদিনে ঘটবে না। এটি ধীরে ধীরে ছোট ছোট লেনদেনের মাধ্যমে বাস্তবতা হয়ে উঠবে। যখন তা স্পষ্ট হবে, তখন হয়তো পরিবর্তনের প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
















