ভারতের শহরগুলোয় আজ এক নতুন নেশা ছড়িয়ে পড়েছে— ওজন কমানোর ইনজেকশন বা ওষুধের প্রতি অদ্ভুত এক আকর্ষণ। পাঁচ বছরে দেশের অ্যান্টি-ওবেসিটি ওষুধের বাজার বেড়েছে ছয় গুণ। যেন এক নতুন যুগের সূচনা, যেখানে মানুষ নিজের শরীরকে বদলাতে চায় এক ফোঁটা ইনজেকশনের জাদুতে।
মুম্বাইয়ের চিকিৎসক রাহুল বক্সি প্রতিদিনই ফোনে ভরে যাচ্ছেন একটাই প্রশ্নে— “ডাক্তার, আমাকে কি ওজন কমানোর ওষুধ শুরু করে দেবেন?” অনেকেই তরুণ পেশাজীবী, যারা চায় দ্রুত দশ কেজি ওজন কমিয়ে আবার পুরনো রূপে ফিরে যেতে। কিন্তু ডাক্তার বক্সির উত্তর একটাই— “এই ওষুধ কোনো জাদু নয়। বন্ধ করলে ওজন ফিরে আসবে, আর চালিয়ে গেলে ব্যায়াম ছাড়া মাংসপেশিই গলবে।”
তবুও শহুরে ভারতের ধনী ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এ যেন এক উন্মাদনা। বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক অতিরিক্ত ওজনের মানুষের দেশ এখন ওজন কমানোর এই নতুন ওষুধের বাজারে এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
ডায়াবেটিসের চিকিৎসার জন্য তৈরি এই ওষুধগুলো এখন ‘ওজন কমানোর চাবিকাঠি’ হিসেবে প্রচার পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শ্রেণির ওষুধ— বিশেষ করে সেমাগ্লুটাইড ও টিরজেপাটাইড— মানুষের ক্ষুধা কমিয়ে দেয়, হজম ধীর করে এবং মস্তিষ্কের ক্ষুধা-নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রকে প্রভাবিত করে। ফলে মানুষ দ্রুত তৃপ্তি অনুভব করে এবং কম খেতে শুরু করে।
এই ওষুধ সপ্তাহে একবার ইনজেকশন হিসেবে নিতে হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ওজন কমতে শুরু করে। কিন্তু চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন— ওষুধ বন্ধ করলে আবার পুরনো অভ্যাস ফিরে আসে, শরীর ওজন ধরে রাখতে পারে না। দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে মাংসপেশি ক্ষয় হতে পারে, যা ভারতীয়দের উচ্চ কার্বোহাইড্রেট ও নিম্ন প্রোটিন খাদ্যাভ্যাসের জন্য আরও বিপজ্জনক।
ডাক্তার অনুপ মিশ্র বলেন, “এমন শক্তিশালী ওষুধ আমরা আগে দেখিনি। কিন্তু এর ব্যবহার যেন সাবধানতার সঙ্গে হয়। কারণ চিকিৎসার নাম করে অনেকেই এখন এটি ব্যবহার করছেন সৌন্দর্যের জন্য।”
চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই কেউ কেউ এক হাজারেরও বেশি রোগীকে এই ইনজেকশন দিয়েছেন— যার অনেকটাই কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে ভারতের বাজারে এই ওষুধের বার্ষিক বিক্রি প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার, যেখানে ২০২১ সালে তা ছিল মাত্র ১৬ মিলিয়ন।
নোভো নরডিস্ক ও এলি লিলি কোম্পানি এখন বাজারের দুই শীর্ষ নাম। প্রতিটি ইনজেকশন পেনের মাসিক খরচ ১৪ হাজার থেকে ২৭ হাজার রুপি— যা অনেক ভারতীয়ের নাগালের বাইরে। তবে মার্চ মাসে এই ওষুধের পেটেন্ট শেষ হলে জেনেরিক সংস্করণ বাজারে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান জেফারিস একে বলছে ভারতের “ম্যাজিক পিল মুহূর্ত”— যদি দাম ও প্রাপ্যতা ঠিক থাকে, বাজার এক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
তবে এই সস্তা সংস্করণের সঙ্গে বাড়ছে ভেজাল ও অবৈধ বিক্রির আশঙ্কা। অনেক বিউটি ক্লিনিক, জিম ট্রেনার এমনকি অনলাইন ফার্মেসিও কোনো বৈধ প্রেসক্রিপশন ছাড়াই এসব ওষুধ বিক্রি করছে। বিবাহ-পূর্ব ‘স্লিমিং প্যাকেজ’ পর্যন্ত চলছে। ফেডারেল মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং ইতিমধ্যেই সতর্কবার্তা দিয়েছেন এই প্রবণতা নিয়ে।
ডাক্তার মুফাজ্জল লাখদেওয়ালা বলেন, “অধিকাংশ মানুষ এখনো বোঝেন না— স্থূলতা এক দীর্ঘস্থায়ী রোগ, কেবল সৌন্দর্যের সমস্যা নয়। আর এই ওষুধকে কসমেটিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে তা ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে।”
চিকিৎসকরা এখন হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা, স্লিপ অ্যাপনিয়া এমনকি হাঁটুর অস্ত্রোপচারের আগেও এই ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন, কারণ ওজন কমলে এসব জটিলতার ঝুঁকি কমে।
এদিকে, ভারতে স্থূলতা মোকাবিলার জন্য অস্ত্রোপচারের হারও আকাশছোঁয়া— ২০০৪ সালে যেখানে মাত্র ২০০টি অস্ত্রোপচার হয়েছিল, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজারে।
তবুও ডাক্তার লাখদেওয়ালার পরামর্শ একেবারে স্পষ্ট— “এই ওষুধগুলো জীবন বাঁচানোর জন্য, নয় রূপ বদলানোর জন্য। যদি কেবল পাঁচ কেজি ওজন কমাতে চাও, তবে চিনি বাদ দাও, সপ্তাহে চারদিন ব্যায়াম করো। তবেই ওষুধ ছাড়াই শরীর নিজেই জেগে উঠবে।”
















