মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হামলার হুমকির প্রেক্ষিতে নাইজেরিয়া জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিতে প্রস্তুত—তবে দেশের সার্বভৌমত্ব যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, নাইজেরিয়ায় ব্যাপক হারে খ্রিষ্টানদের হত্যা করা হচ্ছে, এবং এ পরিস্থিতি রুখতে তিনি দ্রুত সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন।
রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে নাইজেরিয়ার কর্মকর্তারা ও বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের দাবিকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা জানিয়েছেন, দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠী বোকো হারাম ও আল-কায়েদা-সংযুক্ত জঙ্গিরা ধর্ম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করছে।
নাইজেরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কিমিয়েবি ইমোমোটিমি এবিয়ানফা বলেন, “আমরা স্বীকার করি যে দেশে হত্যাকাণ্ড ঘটছে, কিন্তু তা শুধুমাত্র খ্রিষ্টানদের লক্ষ্য করে নয়। মুসলিম, ঐতিহ্যবাহী ধর্মাবলম্বী—সবাইই হামলার শিকার হচ্ছেন। তাই ‘খ্রিষ্টান গণহত্যা’ বলাটা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।”
তিনি আরও বলেন, নাইজেরিয়া সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী, তবে এমন কোনো পদক্ষেপ তারা মেনে নেবে না যা দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানে।
নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা টিনুবুর উপদেষ্টা ড্যানিয়েল বাওয়ালা রয়টার্সকে জানান, দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চায়, তবে সেটি “পারস্পরিক সম্মান ও সীমারেখা বজায় রেখে” হতে হবে। তিনি ট্রাম্পের মন্তব্যকে হালকাভাবে নিয়ে বলেন, “আমরা জানি, ট্রাম্প নাইজেরিয়াকে শ্রদ্ধা করেন। দুই নেতা আলোচনায় বসলে যৌথ সন্ত্রাসবিরোধী উদ্যোগ আরও ফলপ্রসূ হবে।”
ট্রাম্প শনিবার নাইজেরিয়াকে ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের ‘Countries of Particular Concern’ তালিকায় পুনর্ভুক্ত করেছেন। এই তালিকায় চীন, রাশিয়া, মিয়ানমার, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়াও রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট টিনুবু, যিনি দক্ষিণ নাইজেরিয়ার মুসলিম এবং এক খ্রিষ্টান পাদ্রির স্বামী, অভিযোগগুলোকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, সরকার সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। সম্প্রতি তিনি নতুন প্রতিরক্ষা প্রধান হিসেবে এক খ্রিষ্টান কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছেন, যা ধর্মীয় ভারসাম্য রক্ষার প্রতিশ্রুতির অংশ।
টিনুবু এক বিবৃতিতে বলেন, “নাইজেরিয়াকে ধর্মীয়ভাবে অসহিষ্ণু হিসেবে চিত্রিত করা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। আমাদের সরকার খ্রিষ্টান ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে খোলা সংলাপ বজায় রেখেছে এবং নিরাপত্তা সংকট সমাধানে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, নাইজেরিয়ায় “খ্রিষ্টান গণহত্যা” চলছে—এমন দাবি অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর। নাইজেরিয়ান মানবাধিকার আইনজীবী বুলামা বুকারতি আল জাজিরাকে বলেন, “এটি এক বিপজ্জনক ডানপন্থী প্রচারণা, যা ট্রাম্প আজ জোর দিচ্ছেন। বাস্তবে বোকো হারামসহ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো মুসলিম ও খ্রিষ্টান উভয়কেই নির্বিচারে হত্যা করছে।”
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংঘাত পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত নাইজেরিয়ায় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ১,৯২৩টি হামলার মধ্যে ধর্মীয় কারণে খ্রিষ্টানদের লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে মাত্র ৫০টি ক্ষেত্রে। সংস্থাটির বিশ্লেষক ল্যাড সারওয়াত বলেন, “বোকো হারাম ও আইএস পশ্চিম আফ্রিকা শাখা নিজেদের প্রচারণায় খ্রিষ্টানবিরোধী অবস্থান নিলেও বাস্তবে তারা নির্বিচারে সহিংসতা চালায়, যা পুরো সমাজকে বিপর্যস্ত করে।”
ওয়াশিংটনভিত্তিক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের আফ্রিকা বিষয়ক সিনিয়র ফেলো এবেনেজার ওবাদারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নাইজেরিয়ার সঙ্গে সহযোগিতায় কাজ করা, দখলদারিত্বমূলক পদক্ষেপ নয়। “এ মুহূর্তে নাইজেরিয়া সামরিক সহায়তা চায়, আক্রমণ নয়,” তিনি বলেন। “দেশে ঢুকে সরকারকে উপেক্ষা করা উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে।”
















