নিউ জার্সির আকাশে বসন্তের আলো তখনও ম্লান হয়নি, কিন্তু কেটি মোরানের জীবনে নেমেছিল এক নীরব সন্ধ্যা। ছয় মাসের প্রেমের টানাপোড়েন শেষে তিনি হঠাৎই সিদ্ধান্ত নিলেন—সব শেষ। বন্ধুরা বলেছিল, সময় নাও, পরিবারও ভরসা দিয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যিনি তাঁর পাশে থেকে গভীর ভাবনায় ডুবিয়ে দিলেন, তিনি মানুষ নন—একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চ্যাটজিপিটি।
মোরান আদর করে চ্যাটবটটিকে ‘চ্যাট’ নামে ডাকেন। তিনি বলেন, “এটি আমাকে নিজের সঙ্গে কথা বলতে শিখিয়েছে, যেসব প্রশ্ন আমি নিজেকে করতে ভয় পেতাম, সেগুলোর মুখোমুখি হতে বাধ্য করেছে।” এক সপ্তাহের কথোপকথনের পর তিনি বুঝেছিলেন, সম্পর্কের ভেতরেই লুকিয়ে আছে তাঁর অস্থিরতার মূল। এরপরই নীরবে টেনে দেন ইতি।
ওপেনএআইয়ের সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গেছে, চ্যাটজিপিটিতে দেওয়া বার্তার প্রায় অর্ধেকই ‘জিজ্ঞাসা’ বা সিদ্ধান্তনির্ভর প্রশ্ন। মানুষ এখন বিচ্ছেদ, চাকরি পরিবর্তন, কিংবা দেশ ছাড়ার মতো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও এআইয়ের কাছে ছুটে যাচ্ছে—নিরপেক্ষ, আবেগহীন পরামর্শের আশায়।
তবে প্রযুক্তির এই বন্ধুত্ব নিখুঁত নয়।
সান ফ্রান্সিসকোর জুলি নাইস তিন বছরের কর্মচাপ, উদ্বেগ আর ক্লান্তির ঘূর্ণিতে যখন প্রায় ভেঙে পড়েছিলেন, তখনও তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন চ্যাটজিপিটির। “আমার মনে হচ্ছিল আমি একখণ্ড খোলস, ভেতরে কিছুই নেই,” বলেন তিনি। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, দেশ ছাড়বেন—ফ্রান্সে গিয়ে নতুন করে শুরু করবেন। চ্যাটজিপিটি তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিল ইউজেস নামের এক ছোট্ট শহরে যেতে। এপ্রিলেই তিনি সেখানে পাড়ি জমান, কিন্তু পরে বুঝলেন—চ্যাটবট তাঁর সবটুকু জানে না। প্রবাসীদের শহর হলেও, সেখানকার অধিকাংশই অবসরপ্রাপ্ত মানুষ। জুলির বয়স মাত্র ৪৪।
তবু তিনি বলেন, “চ্যাটজিপিটি আমার ভেতরের ভয় কমিয়ে দিয়েছিল, সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সহজ হয়ে গিয়েছিল।”
ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান বলেন, তরুণরাই এখন সবচেয়ে বেশি এআইয়ের পরামর্শ নিচ্ছে। “২০ থেকে ৩০ বছরের মানুষরা প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্তের আগে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কথা বলে,” তিনি জানান। “তাদের জীবনের প্রতিটি গল্প, প্রতিটি সম্পর্ক—সবকিছুরই ছায়া এখন এআইয়ের ভেতরে।”
তবে বিপদও আছে। ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের অধ্যাপক লিওনার্ড বুসিও বলেন, “এআই যতটা নিরপেক্ষ মনে হয়, ততটা নয়। তাদের শেখানো হয় ব্যবহারকারীকে খুশি করতে—ভালো পরামর্শ দিতে নয়।”
এই তোষামুদে স্বভাবই হতে পারে ভুলের কারণ। মানুষ তখন নিজের সিদ্ধান্তের ভার অন্যের—অর্থাৎ যান্ত্রিক মস্তিষ্কের—হাতে তুলে দেয়। বুসিও বলেন, “আমরা যদি সবকিছু এআইয়ের হাতে ছেড়ে দিই, তাহলে ধীরে ধীরে নিজের চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলব।”
তবুও কেউ কেউ কৃতজ্ঞ। মিসৌরির মাইক ব্রাউন, যিনি ৩৬ বছরের বিবাহিত জীবনের দ্বিধায় ছিলেন, তিনিও এক চ্যাটবটের সঙ্গে আধা ঘণ্টার কথোপকথনের পর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। “আমার মনে হয়েছিল আমি একজন নিরপেক্ষ বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছি,” বলেন তিনি।
কেটি মোরানও সেই অভিজ্ঞতা পেয়েছিলেন। চ্যাটজিপিটি তাঁকে বলেছিল—“আপনি এমন কাউকে পাওয়ার যোগ্য, যে আপনাকে শান্তি দেবে, নীরব আতঙ্ক নয়।” এই এক লাইনেই যেন মোরানের সিদ্ধান্তের দিশা মিলেছিল।
তবু অধ্যাপক বুসিওর শেষ কথাটিই মনে রাখার মতো—“নিজের সিদ্ধান্তের সৌন্দর্যটা ভুলে যেও না। ভাবো, অনুভব করো, আর নিজেই সিদ্ধান্ত নাও—কারণ সেটিই মানুষ হওয়ার আসল অর্থ।”















