দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টানা ৮ মাস কমল রফতানি আয়, যার মধ্যে কেবল মার্চেই পতন হয়েছে ১৮ শতাংশের বেশি।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, গত বছরের তুলনায় মার্চে আয় কমেছে প্রায় ৯ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষি ও পাটজাত পণ্যেও এই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে কাঙ্ক্ষিত ক্রয়াদেশ না থাকা, প্রতিযোগী দেশগুলোর আগ্রাসী নীতি এবং ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কারখানা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকাকেই এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসাবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। রফতানির এই টানা পতনের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বৃদ্ধি, টাকার মান কমে যাওয়া এবং শিল্প ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইপিবির হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, মার্চে রফতানির পরিমাণ ৩৪৮ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। যা গত বছরের মার্চে ছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ ওই সময়ের তুলনায় রফতানি কমেছে ৭৭ কোটি ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ৯ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা।
ইপিবির তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে তৈরি পোশাক খাতের রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৩০ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ কম। এ সময়ে নিটওয়্যার রফতানি ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ কমে ১৫ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারে এবং ওভেন পোশাক রফতানি ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমে ১৩ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অন্যান্য খাতের মধ্যে কৃষিপণ্য রফতানি ৯ দশমিক ২১ শতাংশ কমে ৭৩৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর একই সময়ে ছিল ৮০৭ মিলিয়ন ডলার। তবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, এ খাতের রফতানি বেড়ে ৮৭৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগে ছিল ৮৫২ মিলিয়ন ডলার।
কয়েক মাস ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার পর হোম টেক্সটাইল খাতেও সামান্য পতন হয়েছে। এ খাতের রফতানি ০ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে ৬৭৩ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানিও ১ দশমিক ৩০ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৬১৮ মিলিয়ন ডলারে।
অন্যদিকে প্রকৌশল পণ্য খাতে ১৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ খাতের রফতানি বেড়ে ৪৭২ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪০২ মিলিয়ন ডলার।
রফতানি এই টানা পতনের কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্কিন পালটা শুল্ক এবং শুল্ক কেন্দ্র করে প্রতিযোগী দেশগুলো জোটগত প্রধান বাজার ২৭ জাতির জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নে অগ্রাসী রফতানি বাণিজ্য করছে। কম দামে পণ্য রফতানি করা হচ্ছে ওই দেশগুলোতে। এ কারণে গত ৮ মাস ধরেই বাংলাদেশের রফতানি কমছে। এছাড়া ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গড়ে ১০ দিনের মতো কারখানা বন্ধ ছিল। এ কারণে মার্চের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় ধরে উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রম থেমে যায়। মূলত এ কারণেই মার্চে এত বেশি হারে রফতানি কমেছে।
চলতি অর্থবছরের গত ৯ মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে রফতানি কমেছে ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এ সময় মোট রফতানি আয়ের পরিমাণ তিন হাজার ৫৩৯ কোটি ডলারের মতো। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল তিন হাজার ৭৭২ কোটি ডলারেরও কিছু বেশি।
রফতানিকারকরা বলছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে চাহিদা কমে যাওয়ায় গত কয়েক মাস এই খাতে ধারাবাহিক পতন দেখা যাচ্ছে। এছাড়া প্রতিযোগী দেশগুলোর বাজার দখলের অব্যাহত চেষ্টার কারণেও রফতানি কমে যাচ্ছে।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, বেশ কয়েক মাস ধরে ক্রয়াদেশ এমনিতেই কম। মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে তৈরি পোশাকের কাঁচামালের দাম এবং পরিবহণ ভাড়া বেড়ে গেছে। এতে দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। তাতে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমবে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ক্রয়াদেশ আরও কমার শঙ্কা আছে।
তিনি বলেন, যেটুকু ক্রয়াদেশ আছে, সেটুকু উৎপাদনের জন্য শিল্পকারখানায় জ্বালানি সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে। সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের নিয়মিত বৈঠক করতে হবে।
















