ভারতের পশ্চিমবঙ্গের যাত্রা থিয়েটারের ইতিহাসে এক অনন্য নাম চপল ভাদুড়ি, যিনি ‘চপল রানি’ নামে পরিচিত ছিলেন। এক সময় মঞ্চে নারী চরিত্রে অভিনয় করে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও জীবনের শেষভাগে তিনি প্রায় বিস্মৃত হয়ে পড়েন।
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যাত্রা মঞ্চে নারী চরিত্রে পুরুষদের অভিনয় ছিল সাধারণ বিষয়। এই ধারার শিল্পীদের বলা হতো ‘পুরুষ রানি’। তাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলেন চপল ভাদুড়ি, যিনি তার অভিনয় দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করতেন।
১৯৩৯ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া ভাদুড়ি ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে মঞ্চে পা রাখেন। তার কণ্ঠ, অঙ্গভঙ্গি ও উপস্থিতিতে নারীত্বের স্বাভাবিক ছাপ ছিল, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
মঞ্চে তিনি রানি, দেবী, নর্তকী কিংবা বিভিন্ন নারী চরিত্রে অভিনয় করতেন অসাধারণ দক্ষতায়। তার অভিনয় কখনো হাস্যরস বা ব্যঙ্গাত্মক ছিল না, বরং ছিল গভীর ও বিশ্বাসযোগ্য, যা দর্শকদের মনে দাগ কাটত।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রা মঞ্চে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকলে পুরুষদের নারী চরিত্রে অভিনয়ের চাহিদা কমে যায়। ষাট ও সত্তরের দশকে এই পরিবর্তনের ফলে অনেক শিল্পীর মতো ভাদুড়ির ক্যারিয়ারও ধীরে ধীরে অবনমিত হয়।
এক পর্যায়ে দর্শকদের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাতও হন তিনি। জীবিকার জন্য তাকে নানা ছোটখাটো কাজ করতে হয়, এমনকি লোকজ ধারার অংশ হিসেবে পথে ঘাটে অভিনয় করেও জীবন চালাতে হয়েছে।
তার সমসাময়িক অনেক শিল্পী দারিদ্র্যের মধ্যে হারিয়ে গেলেও ভাদুড়ি কোনোভাবে টিকে ছিলেন। তবে দীর্ঘদিন তিনি সমাজের প্রান্তিক অবস্থানেই থেকে যান।
পরবর্তী সময়ে কিছু চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম তার জীবন ও কাজ সম্পর্কে জানতে পারে। এতে তার প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়।
বর্তমানে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই শিল্পী একটি বৃদ্ধ নিবাসে জীবন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে অভিনয় করলেও জীবনের বড় একটি সময় তাকে কাটাতে হয়েছে অবহেলায়।
চপল ভাদুড়ির জীবন শুধু একজন শিল্পীর গল্প নয়, এটি এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন মঞ্চে লিঙ্গ পরিচয় ছিল অভিনয়ের অংশ, আর সেই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে সময়ের স্রোতে।
















