যুক্তরাজ্যে অসুস্থ বা অক্ষম স্বজনদের যত্ন নেওয়া লাখো মানুষ নীরবে এক কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার পর অনেকেই নিজেদের জীবন, কাজ এবং স্বপ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।
পশ্চিম লন্ডনের এক নারী জানান, তার মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়ার পর হঠাৎ করেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। নিয়মিত চিকিৎসা, খাবার, বিশ্রাম—সবকিছুর দায়িত্ব তার ওপর এসে পড়ে। পূর্ণকালীন চাকরি ছেড়ে তাকে সেবাদাতার ভূমিকায় নামতে হয়।
তিনি বলেন, দিন-রাত মায়ের দেখাশোনা করতে গিয়ে নিজের জন্য সময় থাকে না। ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় ও ব্যক্তিগত জীবন হারিয়ে ফেলেছেন বলে অনুভব করেন।
এমন অভিজ্ঞতা শুধু তার একার নয়। অনেকেই একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। কেউ বছরের পর বছর অসুস্থ বাবা-মায়ের যত্ন নিচ্ছেন, আবার কেউ জীবনসঙ্গীর দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।
একজন প্রবীণ সেবাদাতা জানান, তিনি বহু বছর ধরে তার বাবা-মায়ের যত্ন নিচ্ছেন। প্রতিদিনের জীবন ঘুরে দাঁড়িয়েছে রোগীর সময়সূচি ঘিরে। ঘুম কমে গেছে, সামাজিক যোগাযোগও প্রায় নেই বললেই চলে।
আরেকজন নারী প্রায় তিন দশক ধরে অসুস্থ স্বামীর দেখাশোনা করেছেন। নিজের পেশা ছেড়ে পুরো সময় দিয়েছেন পরিবারকে। এখন বয়স ও শারীরিক ক্লান্তি তাকে নতুন করে চিন্তায় ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাজ্যে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ বিনা পারিশ্রমিকে সেবাদানের কাজ করছেন। তাদের মধ্যে অনেকে সপ্তাহে ৫০ ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় সহায়তা পান না।
সরকারি ভাতা সীমিত এবং তা দিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন। ফলে অনেক সেবাদাতা আর্থিক সংকটেও পড়ছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন সেবাদানের ফলে মানসিক চাপ, অনিদ্রা এবং শারীরিক ক্লান্তির মতো সমস্যা বাড়ছে। সেবাদাতারা সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন।
অনেক ক্ষেত্রে এই সেবাদাতারা সমাজে অদৃশ্য থেকে যান। তাদের কাজের মূল্যায়ন কম হয় এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে সব কষ্টের মধ্যেও অনেকেই এই দায়িত্বকে ভালোবাসা ও কর্তব্য হিসেবে দেখেন। পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ তাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
বিশ্লেষকদের মতে, সেবাদাতাদের জন্য আরও কার্যকর সহায়তা, আর্থিক নিরাপত্তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ এই মানুষগুলোর ওপরই অনেকাংশে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার চাপ নির্ভর করছে।
সব মিলিয়ে, সেবাদাতাদের এই নীরব সংগ্রাম সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা, যা প্রায়ই অগোচরে থেকে যায়।
















