নির্বাচন সামনে, অথচ বিতর্কের কেন্দ্র এখন গণভোট। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সর্বশেষ প্রস্তাবেই যেন নতুন এক ঝড় বইয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। কমিশন বলেছে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য একটি গণভোট আয়োজন করা যেতে পারে—নির্বাচনের আগে বা নির্বাচন দিবসেই। এই প্রস্তাবের পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে: ভোট হবে তো?
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনটি অন্তর্বর্তী সরকারের সাত সদস্যের একটি সংস্থা, যার কাজ ছিল সংবিধান, প্রশাসন ও নির্বাচনী সংস্কার নিয়ে ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ একত্র করা। তাদের তৈরি করা জুলাই সনদ মূলত রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, যা সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক যৌথ ঘোষণা হিসেবেই দেখা হচ্ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান, “জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন বিষয়ে তাদের সুপারিশ সরকারকে জমা দিয়েছে।”
কিন্তু বিরোধী দল বিএনপি এই প্রস্তাবে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। দলের প্রতিনিধি ও কমিশনের সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “এখানে নতুন একটি বিষয় ঢোকানো হয়েছে—একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের ধারণা, যা কমিশনে আগে কখনো আলোচনা হয়নি। এই প্রস্তাবে কোনো ঐকমত্য হয়নি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা ভেবেছিলাম কমিশন রেফারি হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু এখন দেখি, রেফারিরা নিজেরাই গোল দিচ্ছে। কমিশন, সরকার ও কিছু দল একপক্ষ হয়ে গেছে, আর আমি রয়ে গেছি প্রতিপক্ষ।”
বিএনপি, যারা আসন্ন ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বলে ধরা হচ্ছে, বলছে—নির্বাচনের আগে গণভোটের ধারণা দেশে নতুন বিভাজন সৃষ্টি করবে। দলটির মতে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে তখনই সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব, তাই এই মুহূর্তে গণভোটের কোনো প্রয়োজন নেই।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী, যা শেখ হাসিনার আমলে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ হয়েছিল, তারা জোর দিচ্ছে নির্বাচনের আগেই গণভোটের ওপর। তাদের দাবি, নভেম্বরেই গণভোট আয়োজন করতে হবে। দলের নেতারা নির্বাচন কমিশনের সাথেও এ বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন। জামায়াতের মতে, নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হলে ভোটারদের পক্ষে বিষয়টি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হবে এবং সহিংসতার আশঙ্কা বাড়বে।
সমালোচকরা বলছেন, ইউনূস হয়তো জামায়াতসহ কঠোর ইসলামপন্থী শক্তিগুলোর প্রভাবের কাছে নত হচ্ছেন, যাতে ক্ষমতায় থাকার সময় বাড়ানো যায়। যদিও তিনি আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচন হবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, কিন্তু গণভোটের প্রস্তাব এখন সেই ঘোষণার ওপরই প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে।
যারা গণভোটের বিপক্ষে, তারা বলছেন—দেশে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে তখনই সংবিধান ও প্রশাসনিক সংস্কার আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা যেতে পারে। তার আগে এই উদ্যোগ শুধু রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
বুধবার বিকেলে অধ্যাপক ইউনূস রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা জামুনায় নির্বাচন প্রস্তুতি নিয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক পরিচালনা করেন। বাইরে তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—বাংলাদেশ কি আগে গণভোটের পথে হাঁটবে, না কি গণতন্ত্রের নির্বাচনী পথে ফিরবে?














