আমদানি করা খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল উপসাগরীয় দেশগুলোতে হাহাকার; পরিবহন ও বিমা খরচ বৃদ্ধিতে ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ার শঙ্কা
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালি কেবল তেলের রুট নয়, বরং এটি ১০ কোটিরও বেশি মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান রসদ বা জীবনরেখা। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে কার্যত শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলায় পুরো অঞ্চলের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের কঠোর জলবায়ু এবং চাষযোগ্য জমির স্বল্পতার কারণে সৌদি আরব তাদের খাদ্যের ৮০ শতাংশ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ৯০ শতাংশ এবং কাতার প্রায় ৯৮ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বাণিজ্যিক জাহাজে ক্রমাগত হামলা এবং জলপথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বিকল্প পথ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে বলেছে, কোভিড-১৯ মহামারি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের পর সরবরাহ শৃঙ্খল এখন ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুতর সংকটের মুখোমুখি।
সংঘাতের ফলে লজিস্টিক জটিলতা এবং বিমা খরচ আকাশচুম্বী হয়ে যাওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। জাহাজ চলাচল নজরদারি সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, ওমান উপকূলসহ এই অঞ্চলে ইতোমধ্যে দুই ডজন জাহাজে হামলা হয়েছে, যার ফলে শিপিং কোম্পানিগুলো এখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে ঝুঁকি নিতে চাইছে না। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বড় খাদ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান কিবসন্স ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ‘টনের পর টন’ তাজা খাদ্যবাহী কনটেইনার এখন প্রণালির বাইরে অনিশ্চিতভাবে অপেক্ষা করছে। অনেক ক্ষেত্রে দুবাইগামী জাহাজ ঘুরিয়ে ভারত বা শ্রীলঙ্কার বন্দরে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা স্থলপথে পরিবহনের খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আগে ইউরোপ থেকে একটি কনটেইনার আনতে যেখানে ৩ হাজার ইউরো খরচ হতো, এখন তা বেড়ে ১৪ হাজার ৫০০ ইউরো ছাড়িয়ে গেছে। ফলে দুগ্ধজাত ও তাজা পণ্যের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই সংকট মোকাবিলায় উপসাগরীয় দেশগুলো (জিসিসি) এখন বিমানপথ ও বিকল্প সড়কপথ ব্যবহারের চেষ্টা করছে। তবে বিমানবন্দরগুলোতে ড্রোন হামলা এবং আকাশপথের উচ্চব্যয় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিকল্প হিসেবে অনেকে যুক্তরাজ্য থেকে তুরস্ক হয়ে স্থলপথে ১২ দিনে সৌদি আরব বা আমিরাতে পণ্য পৌঁছানোর দীর্ঘ পথ বেছে নিচ্ছেন। যদিও ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পণ্য ছাড়পত্র দ্রুত করতে নতুন বাণিজ্য করিডর চালু করেছে, তবুও নিরাপত্তার বিষয়টিই এখন প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর এসকর্ট বা পাহারার আলোচনা চললেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সামরিক সুরক্ষা পেলেও তাতে খাদ্যবাহী কার্গোর চেয়ে তেলবাহী ট্যাংকারই বেশি অগ্রাধিকার পাবে। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, এর প্রভাব রণক্ষেত্র ছাড়িয়ে কোটি মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
















