জাগরোস ফল্ট লাইনের স্বাভাবিক টেকটোনিক ক্রিয়া; নেভাদার গোপন সামরিক কেন্দ্রে কম্পন নিয়ে বাড়ছে রহস্য
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় ফারস প্রদেশের গেরাশে ৪ দশমিক ৩ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) এবং সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যম আল অ্যারাবিয়া জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ভূকম্পনপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলটি জাগরোস ফল্ট অ্যান্ড থ্রাস্ট বেল্টের ওপর অবস্থিত, যেখানে আরবীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত সংঘর্ষের ফলে এ ধরনের কম্পন একটি নিয়মিত ঘটনা।
তবে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই প্রাকৃতিক ঘটনাটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জল্পনা ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকের ধারণা, এটি কোনো ভূগর্ভস্থ গোপন পারমাণবিক পরীক্ষার ফল হতে পারে, যদিও বিশেষজ্ঞরা বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট ভূকম্পন তরঙ্গ আর প্রাকৃতিক টেকটোনিক কম্পনের বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরাকের সুমের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকম্পবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী রামথান জানান, গেরাশের কম্পনটি ছিল একটি ‘ক্ল্যাসিক রিভার্স ফল্ট’ ভূমিকম্প, যা বিশ্বের ১৪৯টি স্টেশনে রেকর্ড করা হয়েছে। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, ১০ কিলোমিটার গভীরে কোনো পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো ভূতাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব এবং এর তরঙ্গ প্রকৃতি প্রাকৃতিক চ্যুতিরেখার সক্রিয়তার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অন্যদিকে, ইরানের নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার বিষয়ে রাষ্ট্রদূত রেজা নাজাফি ইঙ্গিত দিলেও জাতিসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থা জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তাদের কাছে নেই। উল্লেখ্য, গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও নাতানজে হামলার পর ৫ দশমিক ১ মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়েছিল, যা নিয়ে দীর্ঘকাল বিতর্ক চলেছিল।
জল্পনার আগুনি আরও উসকে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা অঙ্গরাজ্যে গত এক সপ্তাহে রেকর্ড করা শতাধিক ক্ষুদ্র ভূমিকম্প। অত্যন্ত গোপনীয় ‘টোনোপাহ টেস্ট রেঞ্জ’ বা কথিত ‘এরিয়া-৫২’-এর কাছাকাছি এই কম্পনগুলো আন্তর্জাতিক কৌশলগত মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক তৎপরতা জোরদার করছে, তখন এই ভূকম্পনগুলো তাদের কোনো উন্নত অস্ত্র পরীক্ষার অংশ হতে পারে। তবে ড. রামথান সতর্ক করে বলেছেন, ৫ মাত্রার বেশি কৃত্রিম কম্পন তৈরি করতে কয়েক মিলিয়ন টন টিএনটি বিস্ফোরণের প্রয়োজন, যা প্রচলিত কোনো পারমাণবিক বোমার সক্ষমতার ঊর্ধ্বে। ফলে গেরাশের ভূমিকম্পকে ‘রাজনৈতিক চাল’ বা ‘বৈজ্ঞানিক অজ্ঞতা’ হিসেবে অভিহিত করে একে পুরোপুরি প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবেই দেখছেন বিজ্ঞানীরা।
















