ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা হামলাটি গভীর রাতের অন্ধকারে নয়, বরং সকালবেলায় চালানো হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শেষ মুহূর্তে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্যের সুযোগ নিতে এ সময়টি বেছে নেয়।
কয়েক মাস ধরেই উভয় দেশ ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। লক্ষ্য ছিল এমন একটি সময় খুঁজে বের করা, যখন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা একই স্থানে উপস্থিত থাকবেন। শনিবার সকালে তেহরানের একটি কম্পাউন্ডে খামেনির উপস্থিতির খবর পাওয়ার পাশাপাশি সেখানে সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বৈঠকের তথ্যও নিশ্চিত করা হয়।
খামেনির চলাচল দীর্ঘদিন ধরে নজরদারিতে ছিল। ব্যবহৃত পদ্ধতি প্রকাশ করা হয়নি, তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে অত্যাধুনিক গোয়েন্দা ও অনুসরণ ব্যবস্থা কাজে লাগানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মানবসূত্রের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
গত বছরের ১২ দিনের সংঘাতে ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করেছিল। তখন টেলিযোগাযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে ব্যক্তিদের গতিবিধি অনুসরণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। কখনো কখনো দেহরক্ষীদের চলাচল পর্যবেক্ষণ করেও মূল ব্যক্তিদের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি নজরদারিতে এভাবে জীবনযাত্রার ধরণ বিশ্লেষণ করে দুর্বল মুহূর্ত চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।
ইরান জানত যে সর্বোচ্চ নেতা শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে রয়েছেন। তবু নিরাপত্তা ও পাল্টা গোয়েন্দা ব্যবস্থায় যে ফাঁক রয়ে গেছে, তা বড় ধরনের ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয় বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নিজেদের পদ্ধতি নিয়মিত পরিবর্তন করে নজরদারির নতুন কৌশল প্রয়োগ করেছে বলেও মনে করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার গোয়েন্দা তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সংগ্রহ করে এবং তা ইসরায়েলের কাছে হস্তান্তর করা হয়, যাতে সরাসরি আঘাত হানা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, দায়িত্ব বণ্টনের অংশ হিসেবে ইসরায়েল নেতৃত্ব লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অবকাঠামোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য আগেভাগে পাওয়ায় দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী যুদ্ধবিমান দিয়ে হামলার পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়। এটি ছিল কেবল একটি বিচ্ছিন্ন আঘাত নয়; বরং বৃহত্তর অভিযানের সূচনা সংকেত। সুযোগ কাজে লাগাতে পরিকল্পনা এগিয়ে আনা হয়।
তেহরানে পৌঁছাতে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে বলে ধারণা করা হয়। স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৯টা ৪০ মিনিটে কম্পাউন্ডে প্রায় ৩০টি বোমা নিক্ষেপ করা হয় বলে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, লক্ষ্যবস্তু ভূগর্ভস্থ আশ্রয়ে অবস্থান করায় একাধিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়, যাতে গভীরে পৌঁছে আঘাত নিশ্চিত করা যায়।
রাজধানীর আরও কয়েকটি স্থাপনায় হামলা হয়, যার মধ্যে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের কার্যালয়ও ছিল। পরে তিনি নিজেকে নিরাপদ বলে জানান। ইরান তিনজন জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
হামলার সময় ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর নিশ্চিত খবর পেতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে।
ইরান আগে থেকেই উত্তরসূরি নির্ধারণসহ সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল বলে জানা গেছে। ফলে এই হত্যাকাণ্ড চলমান সংঘাতে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি আরও পরিষ্কার হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
















