ভারতের আধুনিক শিল্পের অন্যতম প্রতীক এম.এফ. হুসেন—একজন শিল্পী, যিনি ছিলেন যেমন রঙের জাদুকর, তেমনি বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এক অগ্নিসন্তান। ২০১১ সালে মৃত্যুর পরও তাঁর তুলির টান আজও ভারতীয় সংস্কৃতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এ বছর আবারও তাঁর নাম উঠে এসেছে—কখনো নিলামের করতালিতে, কখনো আবার ধর্মীয় ক্ষোভের শিরায় আগুন ধরানো স্লোগানে।
মার্চ মাসে নিউইয়র্কের ক্রিস্টিজ নিলামে হুসেনের ১৪ ফুট লম্বা শিল্পকর্ম “Untitled (Gram Yatra)” বিক্রি হয়েছে অভূতপূর্ব ১৩.৭৫ মিলিয়ন ডলারে—ভারতের আধুনিক শিল্পের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মূল্য। নিলামঘরে হাততালিতে গর্জে উঠেছিল মুহূর্তটি। কিন্তু মাত্র তিন মাস পর মুম্বাইয়ে হুসেনের ২৫টি হারানো চিত্রকর্মের আরেকটি নিলাম ঘিরে তৈরি হয় উত্তেজনা। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির হুমকি, পুলিশের ব্যারিকেড, এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে বাতিলের দাবি—সব মিলিয়ে যেন এক নতুন অগ্নিপরীক্ষা।
শেষ পর্যন্ত নিলাম সম্পন্ন হয় শান্তিপূর্ণভাবে, কিন্তু বিতর্কের ধোঁয়া থামেনি। একদিকে দিল্লির আদালত তাঁর দুটি চিত্র ‘অশালীন’ আখ্যা দিয়ে বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেয়, অন্যদিকে কাতার ফাউন্ডেশন ঘোষণা করে হুসেনের নামে একটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘর নির্মাণের। কাতারই তো ২০০৬ সালে তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিল, যখন হুমকি আর মামলা তাঁকে মাতৃভূমি থেকে নির্বাসিত করে দেয়।
হুসেনকে বলা হয় ‘ভারতের পিকাসো’। তাঁর শিল্প ছিল লোকজ জীবনের গল্প, রঙের উৎসব, দেব-দেবীর প্রতীক আর আধুনিকতার স্পন্দনে ভরা। কিন্তু তাঁর তুলিতে যখন নগ্ন দেবীর চিত্র ফুটে উঠল, ধর্মীয় শ্রদ্ধা ও স্বাধীন সৃজনশীলতার সংঘাত শুরু হলো ভয়াবহভাবে। কেউ তাঁকে বলল ধর্মদ্রোহী, কেউ বলল প্রতিভাবান বিপ্লবী।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প ইতিহাসবিদ ড. দিবা গুজরাল বলেন, “হুসেনকে ঘিরে বিতর্ক আসলে ভারতের সাংস্কৃতিক তাপমাত্রা মাপার এক থার্মোমিটার। কখনো তিনি ছিলেন নায়ক, কখনো জাতির শত্রু—সময়ই নির্ধারণ করেছে তাঁর পরিচয়।”
১৯১৫ সালে মহারাষ্ট্রের পবিত্র শহর পাঁধারপুরে জন্ম হুসেনের। ছোটবেলায় মায়ের মৃত্যু, এরপর গুজরাটে মাদ্রাসায় শিক্ষা—এই দ্বৈত সংস্কৃতি, ইসলাম ও হিন্দুধর্মের মিশ্রণ, গেঁথে গিয়েছিল তাঁর রক্তে। পরে ইন্দোরে লোকনাট্য আর রামায়ণ শুনে বড় হওয়া ছেলেটি একদিন চলে আসে বোম্বাইতে, সিনেমার পোস্টার আঁকতে। সেখান থেকেই তাঁর রঙের বিপ্লবের শুরু।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৪৭ সালে হুসেন ছিলেন বোম্বে প্রগ্রেসিভ আর্টিস্টস গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা—যে দল ইউরোপীয় আধুনিকতা আর ভারতীয় শিকড় মিশিয়ে তৈরি করতে চেয়েছিল এক নতুন দৃশ্যভাষা। তাঁর শিল্পে দেখা যেত গ্রামীণ শ্রম, নারী, দেবী, সিনেমা, রাজনীতি—সবই এক ক্যানভাসে মিলেমিশে যেত যেন এক চলমান উপাখ্যান।
কিন্তু নব্বইয়ের দশকে হিন্দুত্ববাদের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গেই হুসেন হয়ে ওঠেন আঘাতের লক্ষ্য। ১৯৯৬ সালে এক হিন্দু সাময়িকীতে তাঁর সরস্বতীর নগ্নচিত্র প্রকাশের পর শুরু হয় মামলা, হামলা, মৃত্যুর হুমকি। ২০০৬ সালে নিজের নিরাপত্তার জন্য তিনি পাড়ি জমান কাতারে, আর ভারতকে বিদায় জানান এক বিষণ্ণ বিদায়বেলায়।
তবু তাঁর হৃদয়ে রয়ে গিয়েছিল মাটির টান। বন্ধু ও সংগ্রাহক অভিষেক পোদ্দার স্মরণ করেন, “আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম—তুমি কী সবচেয়ে বেশি মিস করো? তিনি বলেছিলেন—‘ভারতের মাটি… সেই কাদা।’”
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হুসেন ছিলেন নিরলস শিল্পযোদ্ধা। তিনি একটানা আঁকতেন, লিখতেন, সিনেমা বানাতেন। মৃত্যুর আগেও তাঁর পরিকল্পনা ছিল ৯৯টি চিত্রকর্মের সিরিজ—আরব সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে, আল্লাহর ৯৯ নামের প্রতীক হিসেবে।
তাঁর তুলির নিচে ভারতীয় সংস্কৃতি এক নতুন মুখ পায়—যেখানে দেবতা ও সাধারণ মানুষ, ধর্ম ও প্রেম, ইতিহাস ও আধুনিকতা মিশে যায় এক অনন্ত রঙের মহাসমুদ্রে।
আজ যখন তাঁর চিত্র কোটি কোটি টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আবারও প্রশ্ন জাগে—ভারত কি প্রস্তুত হুসেনকে তাঁর আসল মহিমায় ফিরে পেতে? নাকি তিনি চিরকালই থেকে যাবেন বিতর্কের ছায়ায়, এক নির্বাসিত প্রতিভা হিসেবে—যিনি নিজের দেশকে ভালোবেসে রঙে লিখেছিলেন, কিন্তু সেই দেশই তাঁকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল?
















