যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদস্যদের অস্ত্র সমর্পণ না করলে ‘নিশ্চিত মৃত্যুর’ হুমকি দেন। কিন্তু তার আহ্বানের পরও বাহিনী আত্মসমর্পণের কোনো লক্ষণ দেখায়নি; বরং ইসরায়েল ও অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ইরানের এই শক্তিশালী কাঠামোকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেননি।
ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত একটি সাংবিধানিক স্বীকৃত সশস্ত্র বাহিনী। এটি নিয়মিত সেনাবাহিনীর পাশাপাশি কাজ করলেও সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার প্রতি জবাবদিহি করে। বাহিনীর আদর্শিক ভিত্তি ‘ভেলায়াত-এ ফকিহ’ ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত, যার মূল লক্ষ্য ইসলামী বিপ্লব ও ধর্মীয় নেতৃত্বের সুরক্ষা।
এই বাহিনীর স্থল, নৌ ও বিমান শাখা রয়েছে। এর অধীনে রয়েছে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ক আধাসামরিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাসিজ এবং দেশের বাইরে বিশেষ অভিযানের জন্য কুদস বাহিনী। প্রায় এক লাখ নব্বই হাজার সক্রিয় সদস্য এবং রিজার্ভসহ মোট প্রায় ছয় লাখ সদস্য নিয়ে এই বাহিনী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাসিজ বাহিনীও ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিপ্লবী গার্ডের অধীনেই পরিচালিত। এটি একটি স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক সংগঠন, যেখানে আদর্শিক অনুগত নাগরিকরা যুক্ত হন। বিভিন্ন বিশ্লেষকের মতে, অর্থনৈতিক সুবিধা ও সামাজিক প্রভাবের সুযোগও অনেককে আকৃষ্ট করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে বাসিজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিপ্লবী গার্ড কেবল সামরিক শক্তিই নয়, ইরানের অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও গভীরভাবে প্রোথিত। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় থেকে তারা অবকাঠামো, জ্বালানি, খনিজ, যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে বিস্তৃত প্রভাব গড়ে তোলে। রাষ্ট্রীয় ভাষায় এটি ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’র অংশ হিসেবে পরিচিত, যা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় সহায়ক বলে দাবি করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন একটি আদর্শিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে শুধু হুমকি দিয়ে ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। ক্ষমতার একাধিক কেন্দ্র, সামরিক ও গোয়েন্দা প্রভাব, এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ মিলিয়ে বিপ্লবী গার্ডের সদস্যদের ব্যাপকভাবে বিচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
কিছু পর্যবেক্ষকের ধারণা, সাম্প্রতিক হামলা ও সর্বোচ্চ নেতা হত্যার ঘটনাও উল্টো বিপ্লবী গার্ডের প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও বাস্তব ক্ষমতা সামরিক কাঠামোর হাতে আরও কেন্দ্রীভূত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সার্বিকভাবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের আত্মসমর্পণের আহ্বান বাস্তবতায় প্রভাব ফেলবে এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। বিপ্লবী গার্ডের আদর্শিক আনুগত্য, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে গভীর সংযুক্তি তাদের অবস্থানকে এখনো দৃঢ় রেখেছে।
















