চুক্তি বাতিল ও রদবদলে প্রশাসনিক শূন্যতা; যোগ্য কর্মকর্তা বাছাইয়ে জটিলতা
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। সম্প্রতি ৯ জন জ্যেষ্ঠ সচিবের চুক্তি বাতিল এবং বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করার ফলে সচিবালয়ের অন্তত ১২টি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বর্তমানে নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় রয়েছে।
প্রশাসনের নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ন্ত্রণকারী ‘এপিডি’ অনুবিভাগ দীর্ঘদিন ধরে অভিভাবকহীন থাকায় রদবদল কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে হওয়া দলীয়করণ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার নিয়োগ বিতর্কের পর যোগ্য ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তা খুঁজে পাওয়া এখন সরকারের জন্য ‘পুলসিরাত’ পার হওয়ার মতো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১. সচিব পর্যায়ে বড় শূন্যতা: বর্তমানে সরকারের ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে অন্তত ১২টিতে কোনো স্থায়ী সচিব নেই।
- চুক্তি বাতিল: পরিকল্পনা কমিশন, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগসহ ৯ জন জ্যেষ্ঠ সচিবের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে।
- জনপ্রশাসনে সংযুক্তি: গত ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়েছে।
২. এপিডি অনুবিভাগের স্থবিরতা: প্রশাসনের বদলি ও পদোন্নতির কেন্দ্রবিন্দু হলো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ’ (এপিডি) উইং। গত বছরের অক্টোবর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ অনুবিভাগটি প্রধানহীন। বর্তমানে জনপ্রশাসন সচিব নিজেই এটি তদারকি করছেন, যা স্বাভাবিক কাজের গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
৩. যোগ্য কর্মকর্তা বাছাইয়ে সংকট: বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসি’ বা মেধাভিত্তিক প্রশাসনের অঙ্গীকার করলেও বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে।
- এসিআর জটিলতা: অনেক কর্মকর্তার অভিজ্ঞতা থাকলেও বিগত সরকারের সময়ে তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) সন্তোষজনক ছিল না, অথবা তারা রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত হয়ে আছেন।
- অভিজ্ঞতার অভাব: যাদের নথিপত্র পরিচ্ছন্ন, তাদের অনেকেরই আবার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করার মতো পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই।
৪. বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ:
- মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া (জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ): তিনি মনে করেন, বিগত সরকারের দলীয়করণ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের পছন্দের লোক বসানোর প্রবণতা পেশাদারত্বকে দুর্বল করেছে। এখন আবারো রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দিলে সমস্যার পুনরাবৃত্তি হবে।
- শামীম আল মামুন (সাবেক সচিব): তাঁর মতে, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থায় অভ্যস্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে গণতান্ত্রিক সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। সৎ ও দক্ষ বঞ্চিত কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করাই এখন বড় কাজ।
৫. বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ: সরকার গঠনের পরপরই ড. নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং এবিএম আব্দুস সাত্তারকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকার বর্তমানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্যতা পূরণের কৌশল যাচাই করছে।
















