১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন—যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে ভিন্নধর্মী ভোট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ বিচারাধীন অবস্থায় নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় তৈরি হয়েছে বড় রাজনৈতিক শূন্যতা। সেই সুযোগে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ইসলামপন্থী জোট শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
ইসলামপন্থী জোটের উত্থান
Jamaat-e-Islami দীর্ঘদিন ধরেই ১৯৭১ সালের ভূমিকার কারণে বিতর্কিত ও প্রান্তিক ছিল। তবে এবার তারা ১১টি দলকে সঙ্গে নিয়ে একটি নির্বাচনী জোট গঠন করেছে। যদিও ইসলামী আন্দোলন শেষ মুহূর্তে আসন ভাগাভাগি নিয়ে সরে দাঁড়ায়, তবু জোটটি ইসলামপন্থী ভোট একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছে।
এক জরিপে দেখা গেছে, Bangladesh Nationalist Party নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থন ৪৪ দশমিক ১ শতাংশ, আর জামায়াত জোটের ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ—অর্থাৎ লড়াই হাড্ডাহাড্ডি। যদিও অন্য কয়েকটি জরিপে বিএনপিকে এগিয়ে রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির রাজনীতি এখন কেন্দ্র-বাম থেকে সরে কেন্দ্র-ডান, এমনকি আরও ডানদিকে ঝুঁকছে।
এনসিপির অপ্রত্যাশিত জোট ও ভেতরের টানাপোড়েন
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের পর আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি শুরুতে এককভাবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেয়। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, এটি আদর্শিক নয়, কেবল নির্বাচনী সমঝোতা—কারণ এক বছরে সারাদেশে সাংগঠনিক ভিত্তি গড়া সম্ভব হয়নি।
তবে এই সিদ্ধান্তে দলের ভেতরে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। কয়েকজন শীর্ষ নেতা প্রকাশ্যে আপত্তি জানিয়েছেন। সমর্থকদের একাংশও প্রশ্ন তুলছেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট করে দলটি কি তার বিকল্প রাজনৈতিক পরিচয় হারাচ্ছে না।
সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতা বিতর্ক
নির্বাচনকে ঘিরে আবারও সামনে এসেছে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা প্রশ্ন। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা মৌলিক নীতি হিসেবে ছিল। পরে সামরিক শাসনামলে এতে পরিবর্তন আনা হয় এবং ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়।
সংবিধান সংস্কার কমিশন এবার ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে রাখার সুপারিশ করেছে, ধর্মনিরপেক্ষতার উল্লেখ ছাড়াই। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্মনিরপেক্ষতা উপযোগী নয়, তবে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
এ নিয়ে বামপন্থী দলগুলো প্রতিবাদ জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মনিরপেক্ষ ও ইসলামপন্থী শক্তির বিভাজন এখন আরও স্পষ্ট ও তীব্র।
নারীর প্রতিনিধিত্বে বড় পতন
১৯৯১ সালের পর প্রায় তিন দশক নারী প্রধানমন্ত্রী দ্বারা শাসিত হয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু এবার বড় কোনো দলেই নারী নেতৃত্ব নেই। মনোনয়নেও নারীদের উপস্থিতি ঐতিহাসিকভাবে কম। বিএনপি মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী দিয়েছে, আর জামায়াত কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি।
জামায়াতের এক শীর্ষ নেতা নারীর নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করলে ১১টি নারী সংগঠন অভিযোগ জানায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সতর্ক করেছেন, এ ধরনের বক্তব্য স্বাভাবিক হয়ে গেলে নারীর প্রতি অবমাননা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে।
দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার নিয়ে অনিশ্চয়তা
দুর্নীতি দীর্ঘদিন ধরেই ভোটারদের বড় উদ্বেগ। অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করলেও অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। স্বচ্ছতা সংক্রান্ত কমিশনের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, আমলাতান্ত্রিক চাপের কারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন সংসদে শ্রমিক, কৃষক, নারী বা সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব কমে যেতে পারে। ফলে নীতি বাস্তবায়নে বৈচিত্র্যের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
সামনে কী?
জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গণভোটও হবে। ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বেছে নেবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যে দলই ক্ষমতায় আসুক, দেশটি এখন ডানমুখী রাজনীতির নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করছে। সংস্কার বাস্তবায়ন ও সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষায় ভবিষ্যৎ সরকার কতটা আন্তরিক হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
















