সিরিয়ায় কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনী সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)–এর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত শুধু সিরিয়ার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর প্রভাব পড়েছে গোটা অঞ্চলের কুর্দি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক হিসাব–নিকাশে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষের সময় ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কুর্দিদের জানানো হয় যে তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারত্বের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এই বার্তা কুর্দিদের কাছে ছিল স্পষ্ট—সংকটময় মুহূর্তে তাদের পাশে দাঁড়াতে আর প্রস্তুত নয় যুক্তরাষ্ট্র।
এই অবস্থান কুর্দি সমাজে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি করেছে। অনেকের চোখে দেশটি আর সংখ্যালঘুদের নির্ভরযোগ্য মিত্র নয়। এর ফলে সিরিয়া ছাড়াও ইরাক, তুরস্ক ও ইরানের কুর্দিদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসছে।
সিরিয়ায় পুনরায় প্রান্তিকতার আশঙ্কা
সিরিয়ার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার পথ খুলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন কুর্দি নেতারা। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে কেন্দ্রীয় শাসন কাঠামোর মধ্যে কুর্দিদের বারবার বঞ্চিত ও আত্মীকরণের শিকার হতে হয়েছে—এই অভিজ্ঞতার কারণে তারা এমন ব্যবস্থাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন।
অতীতে সিরিয়ার রাষ্ট্রব্যবস্থায় কুর্দিদের স্বতন্ত্র পরিচয় স্বীকৃতি পায়নি। কুর্দি ভাষা ও নাম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা ছিল, অনেক কুর্দিকে নাগরিকত্ব থেকেও বঞ্চিত করা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেওয়া প্রেসিডেন্সিয়াল ডিক্রি ও দামেস্ক ও এসডিএফের মধ্যে হওয়া এক সমঝোতায় কুর্দি অঞ্চলের স্বীকৃতির কথা বলা হলেও, চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত থাকায় কুর্দিদের আস্থা তৈরি হয়নি।
বর্তমানে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর বড় অংশ মনে করছে, সশস্ত্র প্রতিরোধ এখন কার্যকর কৌশল নয়। তবে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক গড়লেও তা গভীর অবিশ্বাসের মধ্য দিয়েই হবে।
ইরাকে শিয়া–কুর্দি ঘনিষ্ঠতার সম্ভাবনা
সিরিয়ার পরিস্থিতি ও ইরানে সম্ভাব্য পরিবর্তন ইরাকের শিয়া ও কুর্দি রাজনৈতিক শক্তিগুলোকেও কাছাকাছি এনেছে। অতীতে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকলেও, এখন উভয় পক্ষই ভবিষ্যতে প্রান্তিক হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে অভিন্ন স্বার্থ খুঁজে পাচ্ছে।
সম্প্রতি ইরাকের শিয়া রাজনৈতিক জোট নুরি আল-মালিকিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনয়ন দিলে কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি সেটিকে স্বাগত জানায়। এই অবস্থান একদিকে অভ্যন্তরীণ কুর্দি রাজনীতির অংশ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়া নীতির প্রতিক্রিয়াও বটে। তবে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে এমন শিয়া–কুর্দি ঘনিষ্ঠতা ইরানে প্রভাব কমানোর কৌশলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
তুরস্কে শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ
অনেকদিন ধরেই ধারণা ছিল, তুরস্কে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির সঙ্গে শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সিরিয়ায় কুর্দি প্রশ্নের সমাধানের ওপর। সাম্প্রতিক সংঘর্ষ সেই সম্ভাবনাকে হুমকিতে ফেললেও, এখন পর্যন্ত আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সিরিয়া ও তুরস্কের বিষয়কে আলাদা ফাইল হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা আলোচনার জন্য কিছুটা সুযোগ রেখে দিয়েছে।
ইরানি কুর্দিদের অবস্থান
সিরিয়ার অভিজ্ঞতা ইরানের কুর্দিদেরও সতর্ক করেছে। তারা বুঝতে পারছে, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কতটা অনিশ্চিত। এই বাস্তবতায় সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে কুর্দিরা সামনে না এসে সংযত অবস্থান নিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, বর্তমান শাসনব্যবস্থা বদলেও নতুন কোনো কর্তৃত্ববাদী কাঠামো তৈরি হতে পারে, যেখানে কুর্দিদের অধিকার আবারও উপেক্ষিত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বারবার কুর্দি মিত্রদের পরিত্যাগ করার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে আস্থা হারাচ্ছে। ইরাক ও সিরিয়ার কুর্দিরা এখনো এই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে, কিন্তু এই সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকবে কি না—তা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
















