কয়েক দিন ধরে চলা কথিত যুদ্ধবিরতি শেষ হতেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ও দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভে নতুন করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। রাতভর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হাজার হাজার বাড়িঘর গরমের সুবিধা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা জানিয়েছেন, সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত রাশিয়া ৪৫০টি ড্রোন ও ৬০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। তার অভিযোগ, তীব্র শৈত্যপ্রবাহ শুরু হওয়ার অপেক্ষা করেই মস্কো আবার জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করেছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, প্রচণ্ড শীতের মধ্যে ইউক্রেনের শহরগুলোতে হামলা সাময়িকভাবে বন্ধে সম্মত হয়েছিল রাশিয়া। তবে বাস্তবে সেই ঘোষণা কার্যকর হয়নি বলেই অভিযোগ কিয়েভের।
মঙ্গলবারের হামলায় কিয়েভে অন্তত দুইজন এবং খারকিভে আরও দুইজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো বলেন, রাজধানীতে ১ হাজার ১৭০টি আবাসিক ভবন গরমের সংযোগ হারিয়েছে। এ সময় তাপমাত্রা নেমে গেছে মাইনাস ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
শহরের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তিমুর তকাচেঙ্কো টেলিগ্রামে বলেন, প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যেই কিয়েভকে লক্ষ্য করে আরেকটি বড় হামলা চালানো হয়েছে। তিনি বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার আহ্বান জানান।
হামলায় শহরের পাঁচটি এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিনটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ও একটি কিন্ডারগার্টেন থাকা ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে একটি বহুতল ভবনের ওপরের অংশে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। কিছু গণমাধ্যম জানিয়েছে, রাজধানীর দুটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাশিয়ার হামলায় কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরের শত শত আবাসিক এলাকায় বিদ্যুৎ ও গরমের ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
খারকিভের মেয়র ইহোর তেরেখভ বলেন, মঙ্গলবারের হামলার লক্ষ্য ছিল সর্বোচ্চ ধ্বংস সাধন করা এবং তীব্র শীতে শহরকে গরমহীন করে দেওয়া। তিনি জানান, নেটওয়ার্ক জমে যাওয়ার ঝুঁকি ঠেকাতে ৮২০টি ভবনের গরম সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, খারকিভ অঞ্চলের ইজিয়ুম ও বালাকলিয়া শহরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। উত্তরের সুমি শহরেও দুটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে হামলার খবর পাওয়া গেছে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়ায় একটি ড্রোন হামলায় ৩৮ বছর বয়সী এক নারী নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সেখানকার সামরিক প্রশাসক ইভান ফেদোরভ।
এর আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তার অনুরোধে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শীতকালীন পরিস্থিতিতে কিয়েভ ও অন্যান্য শহরে হামলা বন্ধে সম্মত হয়েছেন। তবে মস্কো বলেছিল, এই বিরতি কেবল রোববার পর্যন্তই কার্যকর থাকবে।
ইউক্রেনের দাবি, জানুয়ারির শেষ দিক থেকে এক সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতির কথা থাকলেও রাশিয়া বাস্তবে হামলা চালিয়েই গেছে।
এই হামলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় নতুন দফার আলোচনার জন্য বুধবার আবুধাবিতে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিবিহা বলেন, কূটনৈতিক উদ্যোগ বা যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি—কিছুই রাশিয়াকে শীতের মধ্যে সাধারণ মানুষের ওপর সন্ত্রাস চালানো থেকে বিরত রাখতে পারেনি।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, শান্তি আলোচনার চেয়ে হামলাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে রাশিয়া। তার ভাষায়, বছরের সবচেয়ে ঠান্ডা দিনগুলোতে মানুষকে আতঙ্কিত করাই তাদের কাছে কূটনীতির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগের দিন জেলেনস্কি বলেছিলেন, সাম্প্রতিক কিছু উত্তেজনা প্রশমন আলোচনার পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। তবে মঙ্গলবারের হামলায় সেই আশার জায়গায় আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
















