ভবিষ্যতে আর্টেমিস অভিযানের মাধ্যমে মানুষ আবার চাঁদে পা রাখলে, সেখানে কাজ করা নভোচারীদের মুখোমুখি হতে হবে একাকিত্ব, চরম পরিবেশ ও কঠিন বাস্তবতার। প্রশ্ন হচ্ছে, এমন নিঃসঙ্গ ও বিপজ্জনক পরিবেশে টিকে থাকতে আসলে কী ধরনের মানুষ প্রয়োজন?
নাসার নভোচারী ভিক্টর গ্লোভার বলেন, মহাকাশে কাজ করা যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা তার চেয়েও কঠিন। তার মতে, এই বিষয়টি আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বলি না। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে একটি অভিযানের সময় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নভোচারীরা আট মাস মহাকাশে আটকে পড়েছিলেন, যা এই ঝুঁকির বাস্তব উদাহরণ।
ভিক্টর গ্লোভার শিগগিরই আর্টেমিস টু মিশনের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। এই অভিযানে তিনি এবং আরও তিনজন সহযাত্রী দশ দিন একটি ছোট ক্যাপসুলে অবস্থান করবেন, যা মানুষকে চাঁদের কক্ষপথের বাইরে আরও দূরে নিয়ে যাবে।
তিনি জানান, সেখানে প্রতিটি সম্পদ সীমিত। পানি বা খাবার শেষ হয়ে গেলে নতুন করে কিছু পাওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও থাকবে না। দৈনন্দিন সাধারণ কাজগুলোও বিরক্তিকর ও মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। এসব পরিস্থিতির জন্য আলাদা মানসিক প্রস্তুতির প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
আর্টেমিস টু হলো চাঁদে মানুষের স্থায়ী প্রত্যাবর্তনের প্রথম ধাপ। ভবিষ্যতে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে একটি ঘাঁটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে নভোচারীদের মাসের পর মাস পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতে হবে। বাইরে থাকবে ধুলোময় ও বায়ুশূন্য পরিবেশ, তীব্র তাপমাত্রা এবং ক্ষতিকর বিকিরণের ঝুঁকি।
এ ধরনের অভিযানের জন্য সঠিক মানুষ বাছাই করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার মহাকাশ চিকিৎসা দলের প্রধান সের্গি ভাকের আরাউহো বলেন, নভোচারী নির্বাচনে কোনো একটি ক্ষেত্রে অসাধারণ মানুষ নয়, বরং সব ক্ষেত্রে ভালো এমন মানুষ খোঁজা হয়। আর সেটিই সবচেয়ে কঠিন।
আগের যুগে নভোচারীরা ছিলেন পরীক্ষামূলক পাইলট, শারীরিকভাবে প্রায় নিখুঁত। এখন শারীরিক মানদণ্ড কিছুটা শিথিল হলেও কিছু অসুখ একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। হাঁপানি, হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা বা রঙ শনাক্ত করতে অক্ষমতা থাকলে অভিযানের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তবে শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি এখন মানসিক ও সামাজিক দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। একাকী ও সীমিত জায়গায় দীর্ঘ সময় সহকর্মীদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে পারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা নয়, বরং দলগত সাফল্যকে অগ্রাধিকার দেওয়াই এখন মূল বিষয়।
এই ধরনের মানসিক চাপ বোঝার জন্য পৃথিবীর চরম পরিবেশে গবেষণা চালানো হচ্ছে। অ্যান্টার্কটিকার কনকর্ডিয়া গবেষণা কেন্দ্রে একদল গবেষক মাসের পর মাস বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকেন। সেখানে কাজ করা ব্রিটিশ সার্জন নিনা পারভিস বলেন, সেখানে থাকতে হলে চাপ, অনিশ্চয়তা ও একঘেয়েমি সামলাতে জানতে হয়।
তার মতে, সহকর্মীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার ও মানসিক সহনশীলতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অ্যান্টার্কটিকায় গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ একাকিত্বে একঘেয়েমি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তাই মানসিক সুস্থতার জন্য যোগব্যায়াম, সৃজনশীল কাজ বা দলগত কার্যক্রম কার্যকর হতে পারে।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা থেকেই ভবিষ্যতের চন্দ্র অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। মহাকাশে বসবাসের জন্য ঘরবাড়ির নকশা কেমন হবে, আলো ও ব্যক্তিগত জায়গা কতটা দরকার—এসব বিষয়ও এখন গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভিক্টর গ্লোভার বলেন, তিনি নিজেও জানেন না চাঁদে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি তিনি কতটা নিতে পেরেছেন। তার ভাষায়, পৃথিবীতে ফিরে এলে তবেই সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।
















