গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর পর ইউক্রেনের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে ফিলিস্তিন বিষয়ে অবস্থান ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউক্রেন নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ার পাশাপাশি কিয়েভে গাজা নিয়ে আলোচনা এখন আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরু হলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি প্রকাশ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানান। সে সময় ফার্স্ট লেডি ওলেনা জেলেনস্কাও বলেন, ইউক্রেনীয়রা ইসরায়েলি জনগণের কষ্ট বুঝতে পারে এবং তাদের সঙ্গে সেই যন্ত্রণা ভাগ করে নেয়। তখন কিয়েভজুড়ে ইসরায়েলের পতাকা সংবলিত বিলবোর্ড দেখা যায়।
সে সময় এই অবস্থানটি ইউক্রেনীয় সমাজের বড় একটি অংশ এবং পশ্চিমা নেতাদের মনোভাবের প্রতিফলন ছিল। তবে যাদের পরিচয়ের সঙ্গে ফিলিস্তিন ও ইউক্রেন—দুটিই জড়িয়ে, তাদের জন্য এই দৃশ্য ছিল বেদনাদায়ক।
গাজায় জন্ম নেওয়া এক চিকিৎসাকর্মী, যিনি প্রায় এক দশক ইউক্রেনে বসবাসের পর দেশটির নাগরিকত্ব পেয়েছেন, বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনি ও ইউক্রেনীয়দের প্রতি আচরণের বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরেই স্পষ্ট। তার ভাষায়, ইউক্রেনীয় পরিচয় নিয়ে ভ্রমণ করলে দরজা খুলে যায়, আর ফিলিস্তিনি পরিচয় নিয়ে চললে সেই দরজাই বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, এটি কষ্টের প্রতিযোগিতা নয়, বরং নীতির প্রশ্ন। মানবাধিকার যদি সার্বজনীন হয়, তবে তা পাসপোর্ট বা জাতীয়তার ওপর নির্ভর করতে পারে না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাজায় চলমান বোমাবর্ষণ ও মানবিক বিপর্যয়কে অনেক ইউক্রেনীয় গণহত্যা হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। তিন শতাধিক ইউক্রেনীয় গবেষক, অধিকারকর্মী ও শিল্পী ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। তাদের একজন গবেষক জানান, গাজায় পরিকল্পিত অনাহার পরিস্থিতি অনেককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। কেউ কেউ এ ঘটনাকে ত্রিশের দশকে সোভিয়েত আমলের দুর্ভিক্ষের সঙ্গে তুলনা করছেন, যেটিকে কিয়েভ গণহত্যা হিসেবে বিবেচনা করে।
তিনি আরও বলেন, সিরিয়াসহ অন্যান্য দেশে ইসরায়েলের হামলাও সেই বয়ানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, যেখানে বলা হচ্ছিল গাজায় কেবল আত্মরক্ষার জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে। কিয়েভে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ শুরু হয়েছে এবং মূলধারার সাংবাদিক ও পডকাস্টাররাও ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন।
তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনের অবকাঠামোর ওপর রুশ হামলা, শীতের মধ্যে বিদ্যুৎ ও গরমের সংকটের কারণে এই আন্দোলন কিছুটা থমকে গেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও ইউক্রেনীয়দের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে। অনেকের কাছে ওয়াশিংটন আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য মিত্র নয়, বরং এমন একটি শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে, যারা ইউক্রেনকে সম্পদের উৎস হিসেবে বিবেচনা করছে এবং একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে নমনীয় অবস্থান নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রকে খনিজ সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার চুক্তিও এই ধারণাকে জোরদার করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই প্রেক্ষাপটে কিয়েভ ফিলিস্তিন ইস্যুতেও অবস্থান কিছুটা নরম করেছে। জেলেনস্কি প্রকাশ্যে বলেছেন, ইউক্রেন ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন—দুটি রাষ্ট্রকেই স্বীকৃতি দেয় এবং বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ বন্ধে কাজ করতে চায়। ২০২৪ সালে ইউক্রেন ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবিক সহায়তা হিসেবে গমের আটা পাঠায়। পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলের একটি আঞ্চলিক হামলার কড়া সমালোচনাও করে ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে ইউক্রেনে আসা এক তরুণী শিক্ষার্থী বলেন, প্রথমে কিয়েভ তাকে নিরাপদ আশ্রয় মনে হলেও এখন অবকাঠামোর ওপর নিয়মিত হামলায় তার মনে হচ্ছে, তিনি এক ধ্বংসস্তূপ থেকে আরেক ধ্বংসস্তূপে এসেছেন। তার ভাষায়, যুদ্ধের চেহারা সব জায়গায়ই এক।
তিনি জানান, আগে ইউক্রেন ও ইউরোপে অনেকেই ফিলিস্তিনিদের অভিজ্ঞতা বুঝতে পারতেন না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে এবং এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠীরাও গাজা নিয়ে জানতে চায় ও সহানুভূতি প্রকাশ করে।
তবে এখনো দ্বিমুখী মানদণ্ড পুরোপুরি দূর হয়নি বলে মনে করেন ওই চিকিৎসাকর্মী। তার মতে, এটি ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থার ফল, যেখানে কার কষ্ট বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা নির্ধারণ করা হয়। তবুও তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই সময়গুলো মানুষকে নীতিনির্ভর সংহতির গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করছে, যা রাজনীতির ঊর্ধ্বে গিয়ে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
















