আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তরুণ ভোটারদের আকর্ষণে নানা অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। চাকরি সৃষ্টি, বেকারদের জন্য নগদ সহায়তা বা সুদমুক্ত ঋণ, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি—সব মিলিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় আশার বার্তা শোনানো হচ্ছে। তবে এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভোটার ও অর্থনীতিবিদেরা।
সাতাশ বছর বয়সী মোহাইমিনুল রাফি বহু বছর ধরে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর মতে, স্থিতিশীল জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ পথ এখনো প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরি। নির্বাচনী প্রচারণায় বেকার তরুণদের জন্য নগদ সহায়তা বা সুদমুক্ত ঋণের প্রতিশ্রুতি শুনে তিনি মনে করেন, এগুলো সাময়িকভাবে সহায়ক হলেও মূল প্রয়োজন একটি সুস্থ চাকরির বাজার ও মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা।
২০২৪ সালে চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে যে গণআন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং তৎকালীন সরকার পতনের দিকে যায়, রাফিও সেই আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। এখন ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে দেশ।
এই নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত দল অংশ নিচ্ছে না। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত একটি বৃহৎ জোট ও অন্য একটি ইসলামপন্থী নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। দুই পক্ষই দেশজুড়ে সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের মূল বার্তা—চাকরি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর ছাড়, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এসব প্রতিশ্রুতির অনেকটাই বাস্তবায়ন করা কঠিন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি কমে চার থেকে পাঁচ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। খাদ্যসহ সার্বিক মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে উঁচু থাকায় মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির, আর রাজস্ব আদায়ের হার এখনো জিডিপির সাত শতাংশের নিচে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতি ফিরলেও পারিবারিক পর্যায়ের সংকট, কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতি কাটেনি। এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচন অনিশ্চয়তা কমাতে পারে বটে, তবে হঠাৎ বড় উন্নতির আশা অবাস্তব।
এই অবস্থায় দুই প্রধান জোটই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে সামনে আনছে। একটি দল পরিবারভিত্তিক কার্ড চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সংখ্যক পরিবারকে মাসিক নগদ সহায়তা বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী, এটি বাস্তবায়নে বছরে বিপুল অর্থ ব্যয় হবে, যা বর্তমান সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটের প্রায় দ্বিগুণ।
অন্য জোট প্রস্তাব করছে একটি সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড, যা জাতীয় পরিচয়পত্র, স্বাস্থ্যসেবা, করব্যবস্থা ও ভাতা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তাদের দাবি, এতে অপচয় কমবে এবং সুবিধা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল চ্যালেঞ্জ কেবল অর্থ বরাদ্দ নয়; বরং সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ, দুর্নীতি ও অপচয় রোধ এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি।
তরুণ ভোটারদের জন্য চাকরির প্রতিশ্রুতিও নির্বাচনের বড় ইস্যু। সরকারি হিসাবে, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার দ্বিগুণের বেশি। এক জোট দেড় বছরের মধ্যে এক কোটি চাকরি সৃষ্টির ঘোষণা দিয়েছে, পাশাপাশি শিক্ষিত বেকারদের আর্থিক সহায়তার কথা বলছে। অন্য জোট পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে প্রশিক্ষণ, জেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান ব্যাংক, উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সার তৈরির পরিকল্পনা দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এত বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করতে হলে দীর্ঘমেয়াদে আট থেকে দশ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে বড় উল্লম্ফন প্রয়োজন।
শিক্ষাখাতেও রয়েছে নানা অঙ্গীকার। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তি সহায়তা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের খাবার কর্মসূচি, বিদেশে পড়াশোনার বৃত্তি বা ঋণ—সবই আলোচনায়। তবে শিক্ষাঋণ নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকেরা, কারণ উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষাঋণের চাপ তরুণদের জন্য বড় বোঝা হয়ে উঠেছে।
রাজস্ব ও করনীতিতেও ভিন্ন ভিন্ন প্রস্তাব এসেছে। করহার কমানো, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, কর ফাঁকি রোধের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, করব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এসব লক্ষ্য অর্জন কঠিন।
কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতেও প্রতিশ্রুতি কম নয়—কৃষকের জন্য কার্ড, সুদমুক্ত ঋণ, ভর্তুকি; স্বাস্থ্যখাতে বিনা মূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা, বিশেষায়িত হাসপাতাল, মা ও শিশু স্বাস্থ্য কর্মসূচি। তবে এগুলো বাস্তবায়নে অর্থ ও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ভোটারদের একাংশ বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দিহান। রাফির ভাষায়, প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ। কিন্তু যদি ব্যবসায় চাঁদাবাজি আর চাকরিতে ঘুষের সংস্কৃতি না বদলায়, তাহলে সবকিছু আবার আগের জায়গাতেই ফিরে যাবে।














