ইতালির বেশিরভাগ শহর যখন শীতের মৌসুমে অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে, তখন আলপসের পাদদেশে অবস্থিত অভিজাত শহর তুরিন ঠিক উল্টো চিত্র তুলে ধরে। ফেব্রুয়ারি মাসেই শহরটি সবচেয়ে বেশি প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে, যেখানে উৎসব, ঐতিহ্যবাহী খাবার আর সামাজিক আড্ডায় শীতকে উপভোগ করার আলাদা রীতি রয়েছে।
ফেব্রুয়ারির শুরুতেই তুরিনে শুরু হয় কার্নিভালের মৌসুম। শহরের বিভিন্ন এলাকায় শোভাযাত্রা, মুখোশধারী চরিত্র, রাস্তার পরিবেশনা আর বাজারকেন্দ্রিক আয়োজন ছড়িয়ে পড়ে। পিয়াজা বর্গো ডোরায় সপ্তাহান্তে বসা প্রাচীন সামগ্রীর বাজারে কার্নিভালের মুখোশ, পুরোনো আসবাব আর ঐতিহাসিক চরিত্রের পুনর্অভিনয় এক অনন্য পরিবেশ তৈরি করে। স্থানীয় বেকারিগুলোতে এ সময় পাওয়া যায় ঐতিহ্যবাহী কার্নিভাল মিষ্টান্ন, বিশেষ করে পাতলা ও খাস্তা বুগিয়ে, যা চিনি গুঁড়ো ছড়ানো অবস্থায় পরিবেশন করা হয়।
পরিবারকেন্দ্রিক আনন্দের জন্য শহরের বড় বিনোদন পার্কে বসে দেশের অন্যতম বৃহৎ কার্নিভাল মেলা। ঐতিহ্যবাহী চরিত্র জিয়ানদুজা ও তার সঙ্গীরা শহরের বিভিন্ন স্থানে দেখা দেন, দর্শনার্থীদের সঙ্গে ছবি তোলেন। মাসের মাঝামাঝি পো নদীতে মুখোশধারীদের নৌযাত্রার মধ্য দিয়ে কার্নিভালের সমাপ্তি ঘটে।
কার্নিভাল শেষ হতে না হতেই শুরু হয় তুরিনের বিখ্যাত চকলেট উৎসব। পিয়াজা ভিত্তোরিও ভেনেতো পরিণত হয় কোকোর সুবাসে ভরা এক বিশাল মিলনমেলায়। স্থানীয় ও জাতীয় চকলেট প্রস্তুতকারীরা তাদের পণ্য উপস্থাপন করেন। শতাব্দীপ্রাচীন চকলেট ঐতিহ্যের জন্য তুরিন ইতালির চকলেট রাজধানী হিসেবে পরিচিত। এখানেই উনিশ শতকে জন্ম নেয় জিয়ানদুজা, যা হ্যাজেলনাট আর চকলেটের মিশ্রণে তৈরি।
শীতের দিনে তুরিনের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হলো বিসেরিন, কফি, গরম চকলেট আর ক্রিমের স্তরযুক্ত পানীয়। ঐতিহাসিক ক্যাফেগুলোতে এই পানীয় শীতের আড্ডার অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্থানীয়দের মতে, শীতে এমন উষ্ণ ও সমৃদ্ধ স্বাদের খাবার মন, শরীর আর হৃদয়কে একসঙ্গে তৃপ্ত করে।
ফেব্রুয়ারির শেষদিকে তুরিনে গুরুত্ব পায় ভার্মুথ সংস্কৃতি। আঠারো শতকের শেষ দিকে এই শহরেই ভার্মুথের আধুনিক রূপ গড়ে ওঠে। ধীরে, সময় নিয়ে উপভোগ করা অ্যাপেরিতিভোর অংশ হিসেবে ভার্মুথ এখানে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। মাসের শেষভাগে শহরজুড়ে স্বাদ গ্রহণ অনুষ্ঠান, আলোচনা ও প্রদর্শনীর আয়োজন হয়।
শীতকালে তুরিনের খাবারও ভারী ও ঐতিহ্যবাহী। ধীরে রান্না করা মাংস, রসুন, মদ আর মশলার ঘ্রাণে ভরা ট্রাটোরিয়াগুলোতে পরিবেশিত হয় বাগনা কাওদা, ফন্দুতা, বিভিন্ন ভাজা খাবার আর ধীরে সেদ্ধ করা মাংসের পদ। খাবারের শেষে থাকে ঘন চকলেট ও আমারেত্তো দিয়ে তৈরি বুনেত পুডিং।
তুরিনের কাছেই ইভরিয়া শহরে কার্নিভালের সময় অনুষ্ঠিত হয় ব্যতিক্রমী কমলার যুদ্ধ। তিন দিনব্যাপী এই উৎসবে দলবদ্ধভাবে কমলা ছোড়ার মাধ্যমে মধ্যযুগীয় বিদ্রোহের প্রতীকী পুনর্অভিনয় করা হয়, যা পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারির তুরিন কোনো বিকল্প মৌসুম নয়, বরং শহরের দৈনন্দিন জীবন, ঐতিহ্য আর আনন্দকে সবচেয়ে কাছ থেকে দেখার সেরা সময়।















