কূটনীতিতে প্রায়ই বাস্তব ফলের চেয়ে প্রতীকী দিকই বেশি গুরুত্ব পায়, আর চীনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের চীন সফরের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো, তিনি আদৌ বেইজিংয়ে গেছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্য ও চীনের সম্পর্ক নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। ব্রিটিশ নাগরিকদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ, লন্ডনে নতুন চীনা দূতাবাস অনুমোদনে বিলম্ব, গণতন্ত্রপন্থী কর্মী জিমি লাইয়ের বিচার—সব মিলিয়ে সম্পর্ক ছিল অস্বস্তিকর। সেই প্রেক্ষাপটে আট বছর পর কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর এই ইঙ্গিত দেয় যে, সফরের পক্ষে যুক্তি নেতিবাচক দিকগুলোর চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন যেভাবে তার দীর্ঘদিনের মিত্রদের প্রতি চাপ বাড়াচ্ছে, সেটিই এই সফরের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। ফলে এই সফরকে সম্পর্ক পুনর্স্থাপনের উদ্যোগ বলা যায় না, বরং এটি নতুন বৈশ্বিক শক্তি বিন্যাসের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়ার একটি পদক্ষেপ।
চীন সফরের এক সপ্তাহ আগেই স্টারমার প্রকাশ্যে বিরল ক্ষোভ প্রকাশ করে আফগানিস্তানে ব্রিটিশ সেনাদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের সমালোচনা করেন। এতে করে এই সফর আগের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরগুলোর তুলনায় আলাদা মাত্রা পেয়েছে। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় নিয়ে কখনোই প্রশ্ন ওঠেনি।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দুই দেশ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে একসঙ্গে কাজ করেছে। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়েও তাদের সহযোগিতা ছিল ঘনিষ্ঠ। চীন প্রশ্নে মতবিরোধ থাকলেও তা ছিল ক্ষণস্থায়ী।
কিন্তু বর্তমান বিশ্ব আর সেই অবস্থানে নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে জোটব্যবস্থার কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্র ছিল, তা নিয়ে এখন মৌলিক প্রশ্ন উঠছে। ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয় এবং তা পুরোপুরি গড়ে উঠতে সময় লাগবে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় স্টারমারের বেইজিং সফর এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন চীনের নেতৃত্বও নতুন পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে ভাবছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা মিত্র নন, তবে জলবায়ু পরিবর্তন বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ে দুই দেশের চিন্তাভাবনার মধ্যে মিল রয়েছে।
এই সফরে কোনো নতুন কৌশলগত জোট গঠনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও মূল্যবোধগত পার্থক্যের কারণে তা বাস্তবসম্মতও নয়। তবুও ছোট ইঞ্জিন রপ্তানিতে বিধিনিষেধ, যা অবৈধ অভিবাসী পরিবহনে ব্যবহৃত হয়, সে বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া দেখিয়েছে যে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কিছু প্রশ্নে যুক্তরাজ্যের জন্য চীনের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন।
সফরে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসে। একটি ব্রিটিশ ওষুধ কোম্পানির বড় অঙ্কের বিনিয়োগ, ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য ৩০ দিনের ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার এবং কিছু ব্রিটিশ সংসদ সদস্যের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এছাড়া বাণিজ্য বাড়ানো ও ব্রিটিশ ব্যবসার জন্য চীনা বাজারে প্রবেশ সহজ করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই সফর চীনের প্রযুক্তিগত উত্থানকে স্বীকার করে নেওয়ার পথও খুলে দিতে পারে। পরিবেশ বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংসহ নানা ক্ষেত্রে চীন এখন বিশ্বে এগিয়ে রয়েছে।
চার দিনের এই সফর সম্পর্কের সব জটিলতা দূর করেনি। তবে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ কীভাবে পথ খুঁজে নেবে, সে বিষয়ে ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এমন এক বিশ্বে, যেখানে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই এবং যেখানে চীনের উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি অন্যদের জন্যও প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে, এই সফর সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
















